The Riding Soldier: গুয়াহাটি কামাখ্যা মন্দির ভ্রমণ গাইড ও দর্শনের নিয়মাবলী | Kamacha Temple Tour & Travel Guide

 খানা পাড়া ক্যাম্প এ ট্রেনিং এর মাঝে একদিন এসে দাঁড়াল এক পরম সৌভাগ্য—কামাখ্যা মায়ের মন্দিরে যাওয়ার সুযোগ। আমাদের ইউনিটের একজন সিনিয়র অফিসারের গেস্টের জন্য ভিআইপি (VIP) টিকিট বা বিশেষ পাস সংগ্রহ করার একটি অফিশিয়াল দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে (যদিও বর্তমানে এই ভিআইপি পাস সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ায়  হয়)। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মনের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব করছিলাম। তাই আর দেরি না করে, পরের দিন শেষ রাত্রে, ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ভোর ৩টে, আমার বিশ্বস্ত রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-কে স্টার্ট দিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম নীলাচল পাহাড়ের উদ্দেশ্যে সেই গুয়াহাটির ঐতিহ্যবাহী খানাপাড়া ফুট ওভারব্রিজের পাস দিয়ে।

Devotees sticking coin offerings on the vermilion covered Tantra Ganesha idol wall at Kamakhya Temple Guwahati
তন্ত্র গণেশ" (Tantra Ganesha / Tantra Ganapati) মূর্তি।

যাওয়ার আগে একজন দায়িত্বশীল রাইডারের মতো আমি গুগলে সার্চ করে এই মন্দিরের ইতিহাস ও রেট ভালো করে দেখে নিয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম, এই নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কামাখ্যা মন্দিরটি সনাতন ধর্মের ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম মহাপীঠ।

Intricately carved antique wooden double door at the entrance of Kamakhya Temple with lion sculptures
মা কামাখ্যা মন্দিরের প্রাচীন ভাস্কর্য ও জোড়া সিংহ খোদাই করা ঐতিহাসিক সিংহদুয়ার (প্রধান প্রবেশপথ)


A sadhu wearing marigold garlands and rudraksha meditating next to an ancient stone sculpture at Kamakhya Temple premises
নীলাচল পাহাড়ে মা কামাখ্যা মন্দির প্রাঙ্গণে ধ্যানমগ্ন এক সাধু বাবা ও পাশে প্রাচীন পাথরের ভাস্কর্য


মহাদেব-সতীর পৌরাণিক উপাখ্যান ও মহাপীঠের জন্ম

পুরাণে বর্ণিত আছে, প্রজাপতি দক্ষ (দেবী সতীর পিতা) একবার এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু তিনি দেবী সতী ও মহাদেব শিব ছাড়া সমস্ত দেব-দেবীকে সেই মহাযজ্ঞে আমন্ত্রণ জানান। পিতা যজ্ঞ করছেন শুনে দেবী সতী মহাদেবের বারণ সত্ত্বেও বিনা আমন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু অহংকারী রাজা দক্ষ যজ্ঞসভায় সবার সামনে ভগবান শিবের খুব নিন্দা ও অপমান করতে শুরু করেন। স্বামীর এই ঘোর অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী যজ্ঞের পবিত্র আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজের দেহত্যাগ করেন।

Main Shikhara dome architecture of Kamakhya Temple with scaffolding for maintenance
নীলাচল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত কামাখ্যা মন্দিরের মূল ঐতিহাসিক প্রধান চূড়া (শিখর)

সতীর মৃত্যুর খবর পেয়ে মহাদেব শিব প্রচণ্ড রাগ ও দুঃখে ফেটে পড়েন। তিনি সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে মহাবিশ্ব ধ্বংসকারী 'তাণ্ডব নৃত্য' শুরু করেন। শিবের এই রুদ্ররূপ দেখে পুরো সৃষ্টি যখন ধ্বংসের মুখে, তখন দেবতাদের অনুরোধে পৃথিবীকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে দেন। সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবীর দেহের অংশগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের মোট ৫১টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে গিয়ে পড়ে , যা আজ 'শক্তিপীঠ' নামে পরিচিত।

A golden bronze lion statue at the entrance of Kamakhya Temple premises Guwahati
মা কামাখ্যা দেবীর বাহন—মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত তেজস্বী ব্রোঞ্জের সিংহ মূর্তি

এই ঘটনার ধারা অনুযায়ী, আসামের গুয়াহাটির এই নীলাচল পাহাড়ে দেবী সতীর 'যোনি এবং গর্ভ' অংশটি পড়েছিল । যেহেতু এটি সৃষ্টির মূল উৎস বা জননেন্দ্রিয়, তাই কামাখ্যাকে সমস্ত শক্তিপীঠের মধ্যে 'মহাপীঠ' বা সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র বলে মানা হয়।

কামদেব ও কামরূপের পৌরাণিক ইতিহাস

এই মন্দিরটি সম্পর্কে আরও একটি অতি প্রাচীন কথা প্রচলিত আছে । মহাদেব দ্বারা কামদেব ভস্ম হওয়ার পর, কামদেবের স্ত্রী রতির কাতর প্রার্থনায় শিব শান্ত হন এবং কামদেবকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেন । কিন্তু জীবন ফিরে পেলেও কামদেব তাঁর আগের সেই অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেন। তখন মহাদেব শিবের পরামর্শে কামদেব নিজের রূপ ফিরে পেতে এই পবিত্র নীলাচল পাহাড়ে এসে দেবী সতীর পতিত অংশের আরাধনা ও কঠোর তপস্যা শুরু করেন।

পরবর্তীতে দেবীর  আশীর্বাদে কামদেব তাঁর সেই মোহময় কামোদ্দীপক কান্তি রূপ ফিরে পান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি স্বর্গীয় স্থপতি বিশ্বকর্মার সাহায্যে এখানে দেবীর প্রথম সুন্দর মন্দিরটি নির্মাণ করেন। কামদেব এখানে নিজের রূপ ফিরে পেয়েছিলেন, তাই এই পবিত্র অঞ্চলের নাম হয় 'কামরূপ' এবং কামদেব যাঁর আরাধনা করেছিলেন, সেই দেবী আজ বিশ্বজুড়ে পূজিত হন 'কামাখ্যা' নামে।

Inner premises view of Kamakhya devasthanam with main shikhara dome in background
মা কামাখ্যা মন্দির প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরীণ পরিক্রমা পথ এবং দূর থেকে দৃশ্যমান মূল চূড়া


Devotees walking on the inner parikrama path courtyard of Kamakhya Temple Guwahati
মা কামাখ্যা দেবালয়ের মূল গর্ভগৃহের পেছনের চত্বর এবং পবিত্র পরিক্রমা প্রাঙ্গণ

স্থাপত্যকলা ও মূর্তিবীহিন গর্ভগৃহের রহস্য :  এই শক্তিপীঠ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি প্রাচীন স্থাপত্যকলা এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার এক সুন্দর মিলনমেলা। এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় রহস্য ও বিশেষত্ব হলো, এখানে দেবীর প্রথাগত কোনো মাটির বা পাথরের মূর্তি নেই! বরং মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে পাথরের একটি প্রাকৃতিক ফাটল বেয়ে নেমে আসা একটি পাহাড়ি ঝরনাধারাকেই দেবীর পবিত্র প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে যখন মা কামাখ্যা রজঃস্বলা হন, তখন এখানকার বিখ্যাত 'অম্বুবাচী মেলা' দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী ও তান্ত্রিকদের ভিড় একত্রিত হয় ।

Front view of Kamakhya Temple inner courtyard with devotees standing near the main structure in Guwahati
মা কামাখ্যা মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার চত্বর এবং সাধারণ লাইনের পরিক্রমা পথ

সবুজ বনের বুক চিরে ধান্নুর আরোহণ: এক অলৌকিক অনুভূতি  যখন আমি আমার বাইক নিয়ে নীলাচল পাহাড়ের ঘন সবুজ বনের বুক ছিঁড়ে পাহাড়ি খাড়াই বাঁকগুলো বেয়ে ওপরে উঠছিলাম, তখন ভোরের সেই হালকা আলো-আঁধারি আর মেঘের খেলায় এক অদ্ভুত স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। পাহাড়ের ঠান্ডা ফুরফুরে হাওয়ায় ভেসে আসছিল কামাখ্যা মন্দিরের সুগন্ধযুক্ত ধূপের পবিত্র গন্ধ আর দূর থেকে প্রতিধ্বনিত হওয়া মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজ।

Devotees sitting on the ancient stone steps of Saubhagya Kund at Kamakhya Temple Guwahati
মা কামাখ্যা মন্দির প্রাঙ্গণের ঐতিহাসিক সৌভাগ্য কুণ্ডের পাথরের সিঁড়ি ও বিশ্রামরত ভক্তবৃন্দ

সেই ঘণ্টাধ্বনি আর ধূপের সুবাস আমার ভেতরের ফৌজি জীবনের যান্ত্রিক ব্যস্ততাকে ধুয়ে মুছে মনকে এক অন্য অলৌকিক জগতে পৌঁছে দিচ্ছিল। বাইক রাইড করার মাঝেই যখন চোখ গেল পাহাড়ের নিচে, দেখলাম ভোরের কুয়াশা মাখা রূপালী ব্রহ্মপুত্র নদের সেই অপরূপ ও মুগ্ধ করা বিশাল রূপ! নদীর ওপর ভোরের আলোর সেই প্রতিফলন চোখ জুড়িয়ে দেয়। আর পাহাড়ি রাস্তার দুধারে গাছে গাছে খেলে বেড়ানো বন্য বানরের দল যেন আমার এই সাতসকালের রাইডকে স্বাগত জানাচ্ছিল।  প্রকৃতির এই অপার শান্তি—আমার ডায়েরিতে  চিরকালের জন্য খোদাই করা থাকবে ।

শক্তি ও ভক্তির এই অপূর্ব পীঠস্থান কামাখ্যা মন্দির জীবনযাত্রায় একবার হলেও দর্শন করা উচিত।

যদি আপনিও কখনো এই পবিত্র স্থানটি দর্শনের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আমার এই ফৌজি ডায়েরির পথরেখা আপনার যাত্রাকে আরও সহজ ও সুন্দর করতে সাহায্য করবে।

দর্শনের সময়সূচী 

সকালের শিফট: সকাল ০৮:০০ টা থেকে দুপুর ০১:০০ টা

দুপুরের শিফট: দুপুর ০২:৩০ টা থেকে বিকেল ০৫:৩০ টা

(দুপুর ০১:০০ টা থেকে ০২:৩০ টা পর্যন্ত দেবীর অন্নভোগের জন্য মূল মন্দির বন্ধ থাকে।)

টিকিট বুকিংয়ের নিয়ম:   আগে টিকিট সংগ্রহ করার জন্য রাত্রী ২-৩ টে থেকে লাইন দিতে হতো , এখন যদিও দর্শণার্থীদের সুবিধার জন্য টিকিট অনলাইন এ শুরু করা হয়েছে 

সাধারণ দর্শন (ফ্রি): সাধারণ লাইনে দর্শনের জন্য কোনো টাকা লাগে না, তবে আপনাকে আগে থেকে Maa Kamakhya Devalaya Free Pass পোর্টাল থেকে একটি ফ্রি ডিজিটাল স্লট বুক করে গেট নম্বর ৬-এ দেখাতে হবে।

বিশেষ দর্শন বা VIP PASS(₹৫০১): লাইনে দাঁড়ানোর সময় বাঁচাতে আপনি মন্দিরের অফিসিয়াল পোর্টাল Maa Kamakhya Devalaya Booking Portal থেকে ৫০১ টাকা দিয়ে আগে থেকেই স্পেশাল টিকিট বুক করে রাখতে পারেন। এখন অফলাইনে কোনো টিকিট পাওয়া যায় না। মন্দিরে প্রবেশের সময় আসল পরিচয়পত্র (যেমন: আধার কার্ড) সাথে রাখা বাধ্যতামূলক।

ডিফেন্স জোয়ানদের জন্য একটি স্পেশাল  ফৌজি টিপস: "আমাদের ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর (Armed Forces) অন-ডিউটি ও অবসরপ্রাপ্ত জোয়ানদের জন্য মন্দির ট্রাস্টের পক্ষ থেকে মাত্র ৫১ টাকায় বিশেষ টিকিট বুকিংয়ের সুবিধা রয়েছে। ফৌজি ভাইয়েরা মায়ের দর্শনে আসার আগে অফিশিয়াল Maa Kamakhya Defence Portal থেকে নিজেদের স্লট ও পাস বুক করে নেবেন এবং সাথে নিজেদের অরিজিনাল মিলিটারি আইডি কার্ডটি অবশ্যই রাখবেন।"

কিছু জরুরি সতর্কতা:

মন্দিরে প্রবেশের সময় বুকিংয়ের প্রিন্টআউট এবং আসল পরিচয়পত্র (আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড) অবশ্যই সাথে রাখবেন ।

গর্ভগৃহের ভেতরে ছবি তোলা বা ভিডিও করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

দালালের (পাণ্ডা) খপ্পরে না পড়ে সরাসরি অফিসিয়াল কাউন্টার বা ওয়েবসাইটের সাহায্য নিন।

এখানে পৌঁছানোর জন্য শক্তি ও ভক্তির এই অপূর্ব পীঠস্থান কামাখ্যা মন্দির জীবনযাত্রায় একবার হলেও দর্শন করা উচিত। 

Google map এর সাহায্য নিতে এখানে click করুন 👈

কিভাবে পৌঁছাবেন 

আপনি যদি ট্রেন এ করে এখানে যেতে চান তাহলে গুয়াহাটি স্টাটিন না গিয়ে কামাখ্যা রেলওয়ে স্টেশন এ নেমে পড়ুন, এখান থেকে মন্দিরের গেট বেশ কাছে।

  গুয়াহাটি স্টেশন , কামাখ্যা স্টেশন , কিমবা গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট  থেকে সরকারি AC এবং NON AC  বাস এ করে এসে নেমে পড়ুন কামাখ্যা গেট এ, বাস থেকে নামার পর বাস স্টপের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে কামাখ্যা মন্দিরের বড় মেইন গেট। এখান থেকেই নীলাচল পাহাড়ে ওঠার রাস্তা শুরু হয়। 

পাহাড়ের উপরে যাওয়ার ব্যবস্থা:  এই মেইন গেটের কাছে নামার পর আপনি মন্দির চত্বরে যাওয়ার জন্য তিনটে সহজ বিকল্প পাবেন 

সরকারি শাটল বাস (ASTC Bus): আসাম পর্যটন দপ্তরের ছোট এসি/নন-এসি বাসগুলো প্রতি ৫-১০ মিনিট পরপর গেটের কাছ থেকে ছাড়ে। ভাড়া মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকা।

 শেয়ার্ড ট্যাক্সি/জিপ: এছাড়া অটো এবং শেয়ার্ড টাটা সুমো বা মারুতি ভ্যান পাওয়া যায়, যা মাথাপিছু নির্দিষ্ট ভাড়ায় (সাধারণত ৩০-৪০ টাকা) সরাসরি পাহাড়ের ওপরে মূল মন্দিরের পার্কিং লটে নামিয়ে দেয়। এছাড়াও ola,uber সবসময় পাওয়া যাই।

প্রাচীন পাথরের সিঁড়ি (On Foot / Rock-cut Staircase): যারা একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন বা ধর্মীয় কারণে পায়ে হেঁটে উঠতে চান, তাদের জন্য পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে ওঠার পাথরের তৈরি দুটি প্রাচীন সিঁড়িপথ রয়েছে  যাকে স্থানীয়ভাবে 'মেখেলা উজোয়া পথ' বলা হয়। পাহাড়ি ধাপ বেয়ে ওপরে উঠতে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগে। বয়স্কদের জন্য টাকার বিনিময়ে এখানে ডুলির ব্যবস্থাও আছে।

আপনি যদি কামাখ্যা মন্দিরের প্রাচীন পাথরের সিঁড়ি তথা 'মেখেলা উজোয়া পথ' দিয়ে ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আপনি কেবল একটি সিঁড়ি ভাঙছেন না, বরং ইতিহাস ও পুরাণের এক মায়াবী গল্পে পা রাখছেন। 

এই পথটির জন্য  হিন্দু পুরাণের একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, আধ্যাত্মিক এবং কিছুটা চতুরতার গল্প রয়েছে,  একবার নরকাসুর দেবী কামাখ্যার অলৌকিক রূপ দেখে মুগদ্ধ হয়ে পড়েন এবং দেবীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে, তখন দেবী সরাসরি বারণ না করে তিনি নরকাসুরকে একটি কঠিন শর্ত  দেন।

দেবী বলেন, নরকাসুরকে এক রাতের মধ্যে পাহাড়ের নিচ থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়ায় দেবীর মূল মন্দির পর্যন্ত পাথরের একটি সুউচ্চ সিঁড়িপথ  তৈরি করতে হবে। শর্ত ছিল, কাজটি রাতের অন্ধকারে শেষ করতে হবে এবং ভোরের আলো ফোটার আগে মোরগ ডাক দেওয়ার আগেই সম্পূর্ণ হতে হবে।

নরকাসুর সেই শর্ত মেনে কাজ শুরু করে দেই এবং রাত্রী শেষ হওয়ার আগের কাজ শেষ হতে চলেছে দেখে  দেবী একটি মায়াবী মোরগকে গলা টিপে ধরেন, যার ফলে ভোর হওয়ার বেশ আগেই সেই মোরগটি অসময়ে ডাক  দিয়ে ওঠে। 

কথিত আছে নরকাসুর যখন অতি দ্রুত এই পাথরের সিঁড়িগুলো বানাচ্ছিলেন, তখন তাড়াহুড়ো করে কাজ করার সুবিধার জন্য মেখেলা (অসমীয়া ঐতিহ্যবাহী পোশাক) কিছুটা ওপরের দিকে গুটিয়ে কাজ করেছিলেন। সেই থেকেই এই খাড়া পাহাড়ি সিঁড়িপথের নাম হয় 'মেখেলা উজোৱা পথ'।


থাকার ব্যবস্থা:

পাহাড়ের উপরে (নীলাচল পাহাড়/মন্দির চত্বর):

ধর্মশালা ও যাত্রীনিবাস: মন্দির কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বেশ কয়েকটি কম বাজেট এর ধর্মশালা এবং যাত্রীনিবাস রয়েছে। খুব কম খরচে (বা বিনামূল্যে) থাকার জন্য এটি সেরা।

আশ্রম ও গেস্ট হাউস: পাহাড়ের ওপরে বিভিন্ন ধর্মীয় মঠ, দেবালয় আখড়া এবং লজ রয়েছে। যারা একদম শান্ত এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে রাত কাটাতে চান, তারা পাহাড়ের ওপরে থাকতে পারেন। তবে এখানে আধুনিক লাক্সারি হোটেল পাবেন না।

পাহাড়ের নিচে (কামাখ্যা গেট ও মালিগাঁও এলাকা): বাজেট এবং স্ট্যান্ডার্ড হোটেল: কামাখ্যা গেট বাস স্টপের আশেপাশে এবং মালিগাঁও (Maligaon) চত্বরে প্রচুর ভালো ভালো বাজেট হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে। 

গুয়াহাটি মেইন সিটি (পল্টন বাজার ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকা): কামাখ্যা গেট থেকে মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার দূরে গুয়াহাটি রেলওয়ে স্টেশন ও পল্টন বাজার (Paltan Bazar) এলাকা। এখানে সব রকমের ৩-স্টার, ৫-স্টার হোটেল, ডরমিটরি এবং ফ্যামিলি লজ পেয়ে যাবেন। যাতায়াত এবং শপিংয়ের জন্য এই এলাকায় থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক।

খাওয়ার ব্যবস্থা 

মন্দিরের বিনামূল্যে অন্নভোগ (Free Prasad):কামাখ্যা মন্দিরে প্রতিদিন দুপুরে ভক্তদের জন্য বিনামূল্যে অন্নভোগ বা মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। দুপুর ১২:০০ টা থেকে দুপুর ০২:০০ টার মধ্যে মন্দিরের ভোগালয়ে (Dining Hall) গিয়ে আপনি এই খিচুড়ি প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং পবিত্র অভিজ্ঞতা।

পাহাড়ের উপরের নিরামিষ হোটেল: মন্দির চত্বরের আশেপাশে প্রচুর ছোট-বড় খাবার দোকান ও হোটেল রয়েছে। এখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ  উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় খাবার, থালি, লুচি-সবজি এবং চা-মিষ্টি পাওয়া যায়। মারওয়াড়ি এবং বাঙালি খাবারও এখানে বেশ জনপ্রিয়।

পাহাড়ের নিচে এবং গুয়াহাটি শহরে:আপনি যদি আমিষ (Non-Veg) বা প্রথাগত অসমীয়া ও বাঙালি খাবার খেতে চান, তবে পাহাড়ের নিচে মালিগাঁও বা পল্টন বাজারে চলে আসতে পারেন। এখানকার রেস্তোরাঁগুলোতে ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া থালি (Assamese Thali) এবং চমৎকার হাঁসের মাংস বা মাছের ঝোল ট্রাই করতে পারেন।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
**ফৌজি ডায়েরি থেকে:** 
আমি পেশায় একজন ভারতীয় সেনা জওয়ান (Indian Army Jawan) এবং নেশায় একজন সোলো মোটো-ব্লগার। কর্মজীবনের কঠোর ডিসিপ্লিন আর দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার ডিউটির ফাঁকে, যখনই সময় পাই, হেলমেট মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-র পিঠে চড়ে। এই ডায়েরিতে আমি মূলত একজন ফৌজির চোখে দেখা ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অফবিট ট্রাভেলের খাঁটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। পথ কখনো শেষ হয় না... জয় হিন্দ! 🪖🏍️🇮🇳



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

The Riding Soldier: অরুণাচল প্রদেশের পরশুরাম কুণ্ড ও প্রথম পাহাড়ি রাইডের গল্প

স্বপ্নের শুরু এবং বাস্তবতার লড়াই

The Riding Soldier: উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া ও খাসি উপকথা (Part 2)