The Riding Soldier: অরুণাচল প্রদেশের পরশুরাম কুণ্ড ও প্রথম পাহাড়ি রাইডের গল্প



আজ যখন আমি আমার স্বপ্নের রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে দুর্গম সব পাহাড়ি পথ দাপিয়ে বেড়াই, তখন স্মৃতির পাতা উল্টালে বারবার একটা বিশেষ দিন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগের এক অক্টোবর মাস। ২০১৫ সালের সেই সোনালী দিনগুলোতে আমার বুকে বাইক রাইডার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও গ্যারেজে কোনো রয়্যাল এনফিল্ড ছিল না। কিন্তু ঠিক তখনই আমার জীবনে এসেছিল প্রথম পাহাড়ি রাইডের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত

অফিসিয়াল কিছু কাজের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে আমি পা রেখেছিলাম অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি শহর তেজুতে (Tezu)। সেখানে আমার সাথে ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু এবং সহকর্মী দুনিয়া দোজি (Duniya Dozi)। দোজির বাড়ি ছিল ওখানেই, সেই সুন্দর তেজু শহরে।

Duniya dozi frend of riding soldier
Duniya dozi 


আজ এই গল্পটি লেখার সময় বুকটা ভারী হয়ে উঠছে, কারণ দোজি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। একজন সেনা জওয়ানের জীবন যে কখন, কীভাবে, কোন সীমান্তে শেষ হয়ে যায়—তা বোধহয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানেন না। দেশের সেবায় নিয়োজিত থেকে সে আজ পরপারে, কিন্তু আমার হৃদয়ে সে চিরকাল বেঁচে থাকবে একজন বীর এবং এক অসাধারণ বন্ধু হয়ে

তেজুতে আমাদের অফিশিয়াল কাজ শেষ হতেই আমরা জানতে পারলাম, সেখান থেকে কিছুটা দূরে লোহিত নদীর (Lohit River) কোল ঘেঁষে অবস্থিত ঐতিহাসিক এবং পবিত্র স্থান 'পরশুরাম কুণ্ড' (Parshuram Kund) মন্দিরের কথা। পাহাড়ি নদী আর মন্দিরের কথা শোনামাত্রই আমার ভেতরের রাইডার মনটা ছটফট করে উঠল। প্ল্যান রেডি হয়ে গেল—আমরা বাইক নিয়েই ওখানে যাব।

বন্ধু দোজি অনেক কষ্ট করে আমাদের জন্য একটি 'পালসার' (Pulsar) বাইক জোগাড় করে আনল। আর এভাবেই শুরু হলো আমার জীবনের প্রথম পাহাড়ি রাস্তায় বাইক চালানোর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। উফফ! চারদিকের সবুজ পাহাড় আর সেই পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তায় বাইকের এক্সিলারেটর ঘোরানোর যে কী স্বর্গীয় অনুভূতি, তা আমি প্রথমবার ওখানেই টের পেয়েছিলাম।

পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার আনন্দটা যখন শেষ হলো, আসল পরীক্ষা শুরু হলো তখন—যখন পাহাড়ের চূড়া থেকে আঁকাবাঁকা বাঁক বেয়ে নিচে নামতে লাগলাম। হঠাৎ রাইড করার সময় আমার চোখ চলে গেল ডানদিকে। কয়েকশো ফুট নিচে গর্জন করে বয়ে চলা লোহিত নদীর সীমানা দেখে আমার হাত-পা রীতিমতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল আর আমি বাইক চালানোর সব শক্তি হারিয়ে ফেললাম।

আমি বাইক থামিয়ে দোজিকে বললাম, "ভাই, আমার দ্বারা আর সম্ভব নয়। এই পাহাড়ি উতরাইতে আমি আর বাইক চালাতে পারছি না।

আমার কথা শুনে দোজি মোটেও রেগে যায়নি। ও ওর সেই চওড়া পাহাড়ি হাসিটা হেসে বাইকের হ্যান্ডেলটা নিজের হাতে তুলে নিল। আমাকে পেছনে বসিয়ে ও পরম দক্ষতায় বাইক চালিয়ে আমাদের পৌঁছে দিল প্রকৃতির সেই অপরূপ সুন্দর পরশুরাম কুণ্ডে।
Lohit River view near Parshuram Kund Arunachal Pradesh



সেদিন লোহিত নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে যে সৌন্দর্য আমি উপভোগ করেছিলাম, তার চেয়েও বড় পাওনা ছিল দোজির মতো একজন বন্ধুর সান্নিধ্য। আজ আমার গ্যারেজে রয়্যাল এনফিল্ড আছে, পাহাড়ি রাস্তায় বাইক চালানোর সাহসও আছে, কিন্তু পেছনে বসে অভয় দেওয়ার মতো সেই হাসিমুখের বন্ধু দুনিয়া দোজি আর নেই।

অরুণাচলের সেই লোহিত নদীর জল যতকাল বইবে, এই ফৌজি রাইডারের হৃদয়ে দুনিয়া দোজির স্মৃতি আর আমার প্রথম পাহাড়ি রাইডের গল্প ততকাল অমর হয়ে থাকবে। স্যালুট তোমায় বন্ধু, যেখানেই থেকো ভালো থেকো।

পূর্ব হিমালয়ের বুক চিরে এক তীব্র, অবাধ্য গতিতে বয়ে চলেছে লোহিত নদী। এই নদী শুধু একটি জলের ধারা নয়, যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। নদীর দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঘন সবুজ পাহাড় এবং 'মিশমি' (Mishmi) পাহাড়ের মনোরম উপত্যকা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা কুয়াশায় ঘেরা জঙ্গল এই লোহিত নদীকে এক রহস্যময় সৌন্দর্যে মুড়িয়ে রাখে।
Lohit River view near Parshuram Kund Arunachal Pradesh


শীতকালে লোহিত নদীর রূপ যেন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তখন এর জল হয়ে ওঠে একদম স্ফটিকের মতো পরিষ্কার এবং এক মায়াবী নীলাভ রঙের। নদীর এই তীব্র ও চঞ্চল স্রোত যখন তলদেশের বিশাল সব পাথরে বাধা পায়, তখন চারপাশের নিস্তব্ধ পাহাড়ের বুকে এক গম্ভীর ও ছন্দময় শব্দের সৃষ্টি হয়। এই শব্দ আর প্রকৃতির এই আদিম রূপ যেকোনো পরিব্রাজক বা প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মনকে এক নিমেষে এক পরম শান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

লোহিত নদীর আশেপাশের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি মূলত 'কামলাং সংরক্ষিত বনাঞ্চল'-এর (Kamlang Wildlife Sanctuary) অন্তর্ভুক্ত। এই অরণ্যের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠা অসংখ্য পবিত্র রুদ্রাক্ষ গাছে ঘেরা। বাতাসের সাথে যখন এই রুদ্রাক্ষ বনের পাতা আর ফলগুলোর মৃদু ঘর্ষণ হয়, তখন লোহিত নদীর তীরের বাতাসে যেন এক আধ্যাত্মিক সুবাস  ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই শান্ত রূপ লোহিত নদীর সৌন্দর্যে এক অনন্য ও অলৌকিক মাত্রা যোগ করে।

এই লোহিত নদীরই এক কিনারায়, পাহাড়ের খাড়া ঢাল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সনাতন ধর্মের এক পরম পবিত্র তীর্থস্থান—'শ্রী পরশুরাম কুণ্ড মন্দির'। মূল রাস্তা থেকে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে যাওয়া প্রায় ২০০টিরও বেশি খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নদীর তীরে অবস্থিত এই কুণ্ড ও মূল মন্দিরে পৌঁছাতে হয়। প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় একদিকে নিচে লোহিত নদীর গর্জন আর অন্যদিকে চারপাশের নিস্তব্ধতা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের জন্ম দেয়।
Parshuram Kund Temple cave Arunachal Pradesh



এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার মহর্ষি পরশুরামের প্রতি উৎসর্গীকৃত। মূল মন্দিরে ভগবান পরশুরামের তেজস্বী মূর্তি ছাড়াও রয়েছে তাঁর মাতা রেণুকা এবং ভগবান বিষ্ণুর দশাবতারের ছোট ছোট উপাসনালয়।
হিন্দু পুরাণ ও মহাভারতের পাতা উল্টালে এই কুণ্ডকে ঘিরে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস জানা যায়। লোকগাথা অনুসারে, পিতার আদেশে মাতৃহত্যার কঠিন পাপের পর মহর্ষি পরশুরামের হাতের কুঠারটি অলৌকিকভাবে তাঁর হাতের সাথেই আটকে যায়। হাজার চেষ্টা করেও তিনি সেই কুঠার হাত থেকে আলাদা করতে পারছিলেন না। এই মাতৃহত্যার মহাপাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং হাতের কুঠার মুক্ত করতে তিনি সারা ভারত ঘুরে বেড়ান।

অবশেষে, এই দুর্গম হিমালয়ের কোলে বয়ে চলা লোহিত নদীর পবিত্র জলে স্নান করার পর এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে—তাঁর হাত থেকে কুঠারটি নিজে নিজেই খসে মাটিতে পড়ে যায় এবং তিনি চিরতরে পাপমুক্ত হন। মহর্ষি পরশুরামের হাত থেকে কুঠার খসে পড়ার সেই পুণ্য স্থানটিতেই আজ গড়ে উঠেছে এই ঐতিহাসিক মন্দির ও পরশুরাম কুণ্ড। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে দেশের হাজার হাজার পুণ্যার্থী এই হিমশীতল লোহিত নদীর জলে স্নান করে নিজেদের ধন্য করতে ছুটে আসেন।

২০১৫ সালের সেই রাইডে লোহিত নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যখন আমি এই ইতিহাস মনে করছিলাম, তখন ফৌজি ডিউটির সব ক্লান্তি যেন ওই স্ফটিকের মতো পরিষ্কার জলে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়েছিল।


প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে মকর সংক্রান্তির (সাধারণত ১৪-১৫ জানুয়ারি) পুণ্য তিথিতে এই লোহিত নদীর তীরে জমে ওঠে এক উৎসবের মহাসমুদ্র। এখানে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত 'পরশুরাম কুণ্ড মেলা', যা প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে চলে। এই মেলা ও পুণ্যস্নানের বিশালতার কারণে একে অত্যন্ত সম্মানের সাথে "উত্তর-পূর্ব ভারতের মহাকুম্ভ" বলা হয়ে থাকে।

মকর সংক্রান্তির সেই হাড়কাঁপানো কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশের (যেমন নেপাল, ভুটান) এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্য (আসাম, মণিপুর, বিহার ইত্যাদি) থেকে লক্ষাধিক সাধু-সন্ন্যাসী, নাগা সাধু এবং সাধারণ পুণ্যার্থী লোহিত নদীর তীরে এসে ভিড় জমান। নদীগর্ভে লুকিয়ে থাকা আদিম পাপনাশের আশায় এবং পরমাত্মার খোঁজে তারা লোহিত নদীর সেই হিমশীতল পবিত্র জলে বুক ডুবিয়ে পুণ্যস্নান করেন। মেলা উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন পুণ্যার্থীদের জন্য বিশেষ যাতায়াত, কঠোর নিরাপত্তা এবং থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা করে থাকে। চারিদিকে তখন বেজে ওঠে মন্ত্রোচ্চারণ, ধূপের সুবাস আর সাধুদের ডমরুর শব্দ—যা পুরো পাহাড়ি উপত্যকাকে এক স্বর্গীয় রূপ দেয়।

লোহিত নদীর এই উৎসবের ইতিহাস যখন শুনছিলাম, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার বন্ধু দোজি হেসে বলেছিল, "ভাই, এখানে যখন এসেছিস, লোহিত নদীর জলে একবার ডুব দিয়ে যা।" সেদিন আমার সেই পাহাড়ি বন্ধু দুনিয়া দোজি নিজেও লোহিত নদীর সেই পবিত্র জলে পুণ্যস্নান করেছিল। সে হয়তো তার জীবনের কোনো পাপ মোচনের জন্য স্নান করেনি, বরং প্রকৃতির সন্তান হিসেবে লোহিত মায়ের আশীর্বাদ মাথায় তুলে নিয়েছিল।

আজ যখন ভাবি, মনের কোণে এক অদ্ভুত সান্ত্বনা খুঁজে পাই। লোহিত নদীর যে পবিত্র জলে স্নান করে মহর্ষি পরশুরাম পাপমুক্ত হয়েছিলেন, যে জলকে কোটি কোটি মানুষ পুণ্যতীর্থ মনে করে—আমার বন্ধু দোজি আজ বেঁচে না থাকলেও, সেদিনের সেই পবিত্র জলের ছোঁয়া তার শরীর ও আত্মাকে স্পর্শ করেছিল। সেনা জওয়ানের এই অনিশ্চিত জীবনে সে হয়তো সময়ের আগেই বিদায় নিয়েছে, কিন্তু লোহিত নদীর সেই পুণ্যস্নানের স্মৃতি আর তার পবিত্র মায়া আমার এই ফৌজি হৃদয়ে চিরকাল অক্ষত থাকবে।

লোহিত নদীর সেই পবিত্র মায়ায় আর পরশুরাম কুণ্ডের সিঁড়ি ভাঙার রোমাঞ্চে আমরা এতটাই মশগুল ছিলাম যে, সময়ের হিসাব রাখার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। যখন লোহিত নদীর জলে আমাদের স্নান শেষ হলো, তখন হঠাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম দুপুর গড়িয়ে সময় প্রায় তিনটে ছুঁই ছুঁই! পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়া আর দীর্ঘ পথ চলার পর পেটের ভেতর তখন তীব্র খিদের জ্বালা শুরু হয়েছে

কিন্তু দুর্গম পাহাড়ের সেই নির্জন প্রান্তে কাছাকাছি কোনো দোকানপাট কিংবা হোটেল ছিল না। পেটের খিদের তাগিদে আমরা দুই বন্ধু মিলে হন্যে হয়ে এদিক-ওদিক কোনো খাওয়ার দোকান খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু মাইলের পর মাইল শুধু নিস্তব্ধ প্রকৃতি আর ঘন জঙ্গল, খাবারের কোনো চিহ্নও কোথাও নেই। যখন আমরা একপ্রকার আশা ছেড়ে দিয়েছি, ঠিক তখনই আমাদের চোখে পড়ল পাহাড়ের ঢালে ছোট, ছিমছাম একটি কুঁড়েঘর।

আমরা ঘরে উঁকি দিতেই সেখানে একজন স্থানীয় পাহাড়ি মহিলাকে দেখতে পেলাম। আমরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলাম, তাই তাকে আমাদের অসহায়ত্বের কথা জানালাম এবং কিছু খাবারের জন্য খুব অনুরোধ করলাম। পাহাড়ি মানুষের মন যে কত বড় আর আন্তরিক হয়, তা আমরা সেদিন আরেকবার প্রমাণ পেলাম। আমাদের অনুরোধ শুনে তিনি হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢুকলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সামনে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর লোহিত নদী থেকে সদ্য ধরে আনা টাটকা মাছের তরকারি পরিবেশন করলেন।

পাহাড়ের সেই নির্জন কুঁড়েঘরে, অচেনা এক মায়ের হাতের লোহিত নদীর মাছ-ভাতের যে স্বাদ আমরা পেয়েছিলাম, তা পৃথিবীর যেকোনো দামী হোটেলের খাবারকেও হার মানায়। তৃপ্তি ভরে খেয়ে আমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে ৫০০ টাকা উপহার হিসেবে দিলাম। সেই সামান্য ৫০০ টাকার বিনিময়ে তিনি আমাদের যে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন, তা টাকার অঙ্কে মাপা অসম্ভব।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে যখন আমরা আবার বাইকের কাছে ফিরলাম, ততক্ষণে পাহাড়ের বুকে নামতে শুরু করেছে মায়াবী পাহাড়ি সন্ধ্যা। চারদিকের জঙ্গল কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে, আর লোহিত নদীর গর্জন যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠছে। এবার ফেরার পালা।

যাওয়ার সময় যে পাহাড়ি বাঁক দেখে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল, ফেরার পথে সেই একই আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে, বাইকের হেডলাইটের আলোয় কুয়াশা কেটে কেটে আমরা দুই বন্ধু মিলে তেজু শহরে ফিরে আসলাম।  দোজির সেই চওড়া হাসি আর বাইকের গর্জন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল অরুণাচলের সেই শীতল সন্ধ্যায়।

আজ এত বছর পর যখনই আমি বাইক নিয়ে কোনো দূর দূরান্তে যাই এবং পাহাড়ি নদীতে মাছ-ভাত খাই, আমার চোখ দুটো অজান্তেই ঝাপসা হয়ে ওঠে। আমি ফিরে যাই ২০১৫ সালের সেই অক্টোবরের বিকেলে, যেখানে লোহিত নদীর তীরে আমার ক্ষুধার্ত পেটে পরম মমতায় অন্ন তুলে দিয়েছিলেন এক পাহাড়ি মা, আর পাশে বসে হাসছিল আমার চিরদিনের বন্ধু দুনিয়া দোজি।


পরশুরাম কুণ্ডে যাওয়ার সম্পূর্ণ যাত্রাপথ (রুট ম্যাপ) এবং অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ইনার লাইন পারমিট (ILP) সংক্রান্ত সমস্ত জরুরি তথ্য নিচে দেওয়া হলো

১. পরশুরাম কুণ্ডে যাওয়ার যাত্রাপথ (Route Map)

পরশুরাম কুণ্ডে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক মাধ্যম হলো আসামের তিনসুকিয়া বা ডিব্রুগড় হয়ে যাওয়া.
আকাশপথে (By Air): সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হলো আসামের ডিব্রুগড় বিমানবন্দর (DIB) (দূরত্ব প্রায় ২০০ কিমি). এছাড়া অরুণাচল প্রদেশের তেজু বিমানবন্দর (TEI) থেকেও আপনি সরাসরি গাড়ি বা ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন

রেলপথে (By Train): সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রধান রেলওয়ে স্টেশন হলো আসামের তিনসুকিয়া (TSK). গুয়াহাটি বা দেশের অন্য প্রান্ত থেকে ট্রেনে তিনসুকিয়া এসে নামা সবচেয়ে সুবিধাজনক, এখান থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়া যাওয়া যাই 


২. ইনার লাইন পারমিট (ILP) সংক্রান্ত তথ্য
অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা নন এমন যেকোনো ভারতীয় নাগরিকের সেখানে প্রবেশের জন্য ইনার লাইন পারমিট (ILP) নেওয়া বাধ্যতামূলক.
আবেদনের মাধ্যম: আপনি ঘরে বসেই অরুণাচল সরকারের অফিশিয়াল eILP পোর্টাল (eilp.arunachal.gov.in) থেকে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন

প্রয়োজনীয় নথিপত্র:
যেকোনো একটি সরকারি পরিচয়পত্র (যেমন: আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি বা ড্রাইভিং লাইসেন্স)
.পাসপোর্ট সাইজ ছবি
.স্থানীয় কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা হোটেল বুকিংয়ের বিবরণ (অপশনাল, তবে থাকলে ভালো).

ফি ও বৈধতা:

ট্যুরিস্ট ই-আইএলপি (eILP) সাধারণত ৩০ দিন পর্যন্ত বৈধ থাকে.
অনলাইন আবেদনের জন্য মাথাপিছু প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা সরকারি ফি দিতে হয় (দিন সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে). সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এটি অ্যাপ্রুভ হয়ে যায়.


অন-অ্যারাইভাল বা অফলাইন ILP:আপনি যদি অনলাইনে না করেন, তবে আসাম-অরুণাচল সীমান্তের দিরক চেক গেট (Dirak Check Gate) বা সুনপুরা চেক গেটে (Sunpura Check Gate) অন-স্পট প্রয়োজনীয় নথি দেখিয়ে অফলাইন পারমিট সংগ্রহ করতে পারবেন
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

**ফৌজি ডায়েরি থেকে:** 
আমি পেশায় একজন ভারতীয় সেনা জওয়ান (Indian Army Jawan) এবং নেশায় একজন সোলো মোটো-ব্লগার। কর্মজীবনের কঠোর ডিসিপ্লিন আর দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার ডিউটির ফাঁকে, যখনই সময় পাই, হেলমেট মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-র পিঠে চড়ে। এই ডায়েরিতে আমি মূলত একজন ফৌজির চোখে দেখা ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অফবিট ট্রাভেলের খাঁটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। পথ কখনো শেষ হয় না... জয় হিন্দ! 🪖🏍️🇮🇳


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

স্বপ্নের শুরু এবং বাস্তবতার লড়াই

The Riding Soldier: উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া ও খাসি উপকথা (Part 2)