The Riding Soldier: উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া ও খাসি উপকথা (Part 2)
Read this post in english (click here)
উমিয়াম হ্রদ শিলং
উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া
অশ্রুর হ্রদ: এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আবেগ ও পৌরাণিক উপকথা
পাহাড়ের চূড়া থেকে যখন প্রথমবার উমিয়াম হ্রদের দিকে তাকালাম, আমার বাইকের এক্সিলারেটরে থাকা হাতটা যেন নিজে নিজেই নরম হয়ে এলো। আমি একপাশে আমার ধান্নুকে দাঁড় করিয়ে হেলমেটটা খুলে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। চারদিকের ঘন সবুজ পাইন বনে ঘেরা ছোট-বড় পাহাড়, আর তার ঠিক মাঝখানে শান্ত, নিস্তরঙ্গ এক বিশাল নীল জলের মহাসমুদ্র।
তবে এই উমিয়াম হ্রদের শান্ত ও সুন্দর রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আবেগ এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা। খাসি ভাষায় ‘উম’ (Um) শব্দের অর্থ পানি বা জল, এবং ‘ইয়াম’ (iam) শব্দের অর্থ কান্না বা চোখের জল। অর্থাৎ, ‘উমিয়াম’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো “অশ্রুর হ্রদ” (Water of Tears)।
এই নামকরণের পেছনে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর লোককথা প্রচলিত রয়েছে। খাসি উপকথা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে স্বর্গ থেকে দুই বোন মর্ত্যের এই সুন্দর পাহাড়িয়া অঞ্চলে বেড়াতে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আকাশ থেকে নামার পথে তারা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ছোট বোনটি হারিয়ে যায়। বড় বোন যখন মেঘালয়ে পৌঁছে বুঝতে পারে যে তার বোন আর বেঁচে নেই বা হারিয়ে গেছে, তখন সে গভীর শোকে ভেঙে পড়ে। তার চোখ থেকে অবিরাম ঝরে পড়া অশ্রুধারা পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসে এবং সেই কান্নার জলেই সৃষ্টি হয় আজকের এই উমিয়াম হ্রদ। স্থানীয় মানুষ আজও মনে করেন, এই হ্রদের প্রতিটি ঢেউ আসলে এক বোনের ভালোবাসার এবং বিচ্ছেদের সুগভীর প্রতীক।
রূপকথার আড়ালে বাস্তব ইতিহাস: ভিটেমাটি হারানোর বেদনা ও নীরব সাক্ষী
পৌরাণিক লোককথার পাশাপাশি ১৯৬০-এর দশকে হ্রদটি যখন মানবনির্মিত বা কৃত্রিম রূপ পায়, তখন তার পেছনে যুক্ত হয় এক করুণ ঐতিহাসিক এবং বাস্তব আবেগ। এটি কেবল একটি জলরাশি নয়, এর শান্ত জলের নিচে চাপা পড়ে আছে শত শত মানুষের চোখের জল আর ভিটেমাটি হারানোর বেদনা।
আজকের এই দিনে এসেও স্থানীয় বয়স্ক মানুষ যখন এই শান্ত নীল জলের দিকে তাকান, তখন তারা হ্রদের তলদেশে হারিয়ে যাওয়া তাদের শৈশব, স্মৃতি এবং প্রাচীন খাসি সংস্কৃতির বিলীন হয়ে যাওয়া স্পন্দন অনুভব করেন। বিজ্ঞান ও উন্নয়নের প্রয়োজনে যে ত্যাগ তারা স্বীকার করেছিলেন, উমিয়াম হ্রদ আজ সেই ত্যাগের এক নীরব সাক্ষী।
তাই উমিয়ামের সৌন্দর্য সাধারণ পর্যটকদের কাছে কেবল এক রূপকথার মতো মনে হলেও, স্থানীয় পাহাড়িয়া মানুষের কাছে এর প্রতিটি জলকণা একাধারে স্বর্গীয় লোকগাথা এবং নিজেদের মাটি ও শেকড় হারানোর এক নীরব দীর্ঘশ্বাসের নাম।
হৃদয়ের পরম শান্তি
উমিয়াম হ্রদের কিনারায় দাঁড়িয়ে খাসি পাহাড়ের সেই শান্ত, স্তব্ধ জলের দিকে তাকিয়ে আমার হৃদয়ে এক অদ্ভুত, পরম শান্তি নেমে এলো। আকাশের সাদা মেঘের দল যখন সেই স্ফটিকের মতো পরিষ্কার জলের বুকে প্রতিচ্ছবি ফেলে, তখন মনে হয় স্বয়ং প্রকৃতি যেন এখানে কোনো এক জীবন্ত ক্যানভাস বিছিয়ে রেখেছে।হ্রদের বুকে আলতো করে বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা বাতাস যখন আমার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই প্রকৃতির নিজস্ব একটা নিরাময় ক্ষমতা আছে—যা মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মনের সব চিন্তা আর ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। দূরে দু-একটা ছোট নৌকা শান্ত জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল, যা এই নিস্তব্ধতার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কিছুক্ষণ হ্রদের একদম কোল ঘেঁষে হেঁটে বেড়ালাম। পাহাড়, জল আর ইতিহাসের এই মিলনমেলা দুচোখ ভরে উপভোগ করার পর, আমি আমার স্বপ্নের বাইক ধান্নুর দিকে তাকালাম। রয়্যাল এনফিল্ডের সেই মেটালিক বডির ওপর যখন পাহাড়ি বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে পড়ছিল, তাকে দেখতে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। এখানে বেশ কিছু চমৎকার ছবি তুলে নিলাম—ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হলো এক রাইডারের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত।
উমিয়াম হ্রদ
বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসার আগেই আমার আবার রাইড শুরু করতে হলো, কারণ আমার গন্তব্য—মেঘের রানী 'শিলং' শহর তখনো কিছুটা দূরে। উমিয়াম হ্রদের এই শান্ত, মায়াবী ও ঐতিহাসিক রূপ হৃদয়ে ধারণ করে আমি আবার বাইকের স্টার্ট দিলাম।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
**ফৌজি ডায়েরি থেকে:**
আমি পেশায় একজন ভারতীয় সেনা জওয়ান (Indian Army Jawan) এবং নেশায় একজন সোলো মোটো-ব্লগার। কর্মজীবনের কঠোর ডিসিপ্লিন আর দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার ডিউটির ফাঁকে, যখনই সময় পাই, হেলমেট মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-র পিঠে চড়ে। এই ডায়েরিতে আমি মূলত একজন ফৌজির চোখে দেখা ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অফবিট ট্রাভেলের খাঁটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। পথ কখনো শেষ হয় না... জয় হিন্দ! 🪖🏍️🇮🇳






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন