The Riding Soldier: গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের যান্ত্রিক ঘরে প্রকৃতির সহজ পাঠ ( শেষ পর্ব )
পূর্ববর্তী পর্ব পড়তে click করুন
বইয়ের পাতার জটিল পড়া, এবং জটিল সমীকরণ যখন আমরা পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থ করি, তখন বিজ্ঞানকে বড় কঠিন মনে হয়। কিন্তু সেই বিজ্ঞানই যখন চার দেওয়াালের গণ্ডি পেরিয়ে বিজ্ঞান কেন্দ্রের (Science Centre) খোলা গ্যালারিতে এসে দাঁড়ায়, মানুষ যখন সেগুলোকে নিজের চোখে দেখে, হাত দিয়ে স্পর্শ করে আর মন থেকে অনুভব করে, তখন বিজ্ঞান আর কঠিন থাকে না—হয়ে ওঠে একদম জলের মতো সহজ, আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক। গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের ভেতরে যখন আমি এক এক করে বিজ্ঞানের এই মডেলগুলোর সামনে দাঁড়াচ্ছিলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল—প্রকৃতির এই সহজ মেকানিজমই আসলে আমাদের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।
১. সালোকসংশ্লেষ ও কার্বন চক্র: জীবন ও প্রকৃতির ভারসাম্য : সায়েন্স সেন্টারের বায়োলজি সেকশনে ঢুকতেই চোখে পড়ল কীভাবে গাছপালা নিজের খাবার নিজে তৈরি করে, তার এক চমৎকার প্রক্রিয়া—সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis) মডেল। আমরা সবাই জানি গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, কিন্তু এখানে আলো-ঝলমলে ডিসপ্লেটির সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়—প্রকৃতি কতটা নিখুঁত! গাছ কীভাবে নিরবে সূর্যের আলো, মাটি থেকে টেনে নেওয়া জল আর আমাদের ত্যাগ করা বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করে পরম মমতায় তা থেকে শর্করা তৈরি করছে, আর আমাদের জীবন রক্ষার জন্য বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছে বিশুদ্ধ অক্সিজেন।
কার্বন চক্র (Carbon Cycle)
সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis)
তার ঠিক পাশেই রয়েছে কার্বন চক্র (Carbon Cycle) মডেল। সমুদ্রের নীল জলরাশি থেকে শুরু করে বায়ুমণ্ডলের কার্বন বিনিময়ের এই চক্রটি আমাদের এক কঠিন বাস্তব মনে করিয়ে দেয়। শিল্পকারখানা, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা আমাদের যান্ত্রিক জীবন কীভাবে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট করে পৃথিবীর উষ্ণতা (Global Warming) বাড়িয়ে চলেছে, তা এই মডেলের ঘূর্ণায়মান তীরচিহ্নগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রকৃতির এই নিখুঁত ব্যালেন্স যদি আমরা ধ্বংস করে দিই, তবে সীমান্তে নয়, আমাদের নিজেদের ঘরেই মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
. অয়েল রিফাইনারি মডেল: মাটির নিচের তরল সোনা শোধন: আমাদের প্রতিদিনের পথচলায় জ্বালানি বা Fuel (ফুয়েল) যে কতটা প্রয়জনীয় , তা একজন মোটরবাইক রাইডার চেয়ে আর কে বেশি ভালো জানবে! আমার 'ধান্নু' (Royal Enfield)-র ট্যাংকে যে পেট্রোল বা বারুদভরা গাড়ির ইঞ্জিনে যে ডিজেল পোড়ানো হয়, তা মাটির নিচ থেকে ঠিক কীভাবে তোলা এবং প্রসেস করা হয়, তার একটি সুবিশাল লাইভ মিনিয়েচার অয়েল রিফাইনারি (Oil Refinery) মডেল এখানে রাখা আছে।

মিনিয়েচার অয়েল রিফাইনারি (Oil Refinery)
মহাকাশ রসায়ন ও পিএসএলভি: ভারতের মহাজাগতিক জয়যাত্রা : সায়েন্স সেন্টারের অন্যতম আকর্ষণীয় কোণ হলো মহাকাশ রসায়ন (Space Chemistry)। সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের গর্ব, ইসরোর (ISRO) তৈরি PSLV (Polar Satellite Launch Vehicle) রকেটের মডেল। তার পাশেই একটি বিশাল বৃত্তাকার স্ক্রিনে গর্জে উঠে আকাশে পাড়ি দিচ্ছে ভারতের রকেট।
PSLV (Polar Satellite Launch Vehicle)
রকেটের প্রপেলান্ট বা জ্বালানির পেছনে যে রসায়ন কাজ করে—হাইড্রাজিন এবং ডাই-নাইট্রোজেন টেট্রাঅক্সাইডের সেই ভয়ানক রাসায়নিক বিক্রিয়া, যা হাজারো টন ওজনের রকেটকে মাধ্যাকর্ষণের বুক চিরে মহাকাশে ছুঁড়ে দেয়, তা দেখলে একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। আমাদের দেশের সুরক্ষার স্যাটেলাইটগুলো এভাবেই মহাকাশে আমাদের 'অদৃশ্য চোখ' হয়ে পাহারা দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের স্মৃতির সরণি: এঁরা সেই মহান মনীষী, যাঁরা ল্যাবরেটরির নির্জন ঘরে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নির্লস পরিশ্রম করে বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার করেছেন। নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের দেশকে বিশ্বমঞ্চে মহান করেছেন এবং এই পৃথিবীকে আমাদের বসবাসের যোগ্য ও আধুনিক বানিয়েছেন। সীমান্তের সৈনিকেরা যেমন রক্ত দিয়ে দেশ রক্ষা করে, এই বিজ্ঞানীরা তেমনই মেধা দিয়ে দেশের অগ্রগতির চাকা সচল রাখেন।
ক্যামেরা ও মানুষের চোখ: একটু সামনে এগোতেই দেখা মিলল একটি চমৎকার মেকানিক্যাল মডেল, যার ক্যাপশন ছিল—"Camera function like an eye" (ক্যামেরা আর চোখের কার্যপ্রণালী একে অপর পরিপূরক)।
Camera function like an eye" (ক্যামেরা আর চোখের কার্যপ্রণালী একে অপর পরিপূরক)
পাচনতন্ত্র ও ফুসফুসের মেকানিজম: শরীরের ভেতরের আস্ত এক রিফাইনারি: পরের গ্যালারিটি ছিল মানুষের অ্যানাটমি বা শরীরতত্ত্বের। সেখানে একটি বড় টেবিলের ওপর মানুষের সম্পূর্ণ পাচনতন্ত্র (Human Digestive System)-এর এক জীবন্ত ত্রিমাত্রিক মডেল রাখা আছে। মুখগহ্বর থেকে শুরু করে পাকস্থলী, লিভার এবং ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের সেই প্রক্রিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় রসায়ন শুধু পরীক্ষাগারেই নয়, আমাদের নিজেদের শরীরের ভেতরেও প্রতি সেকেন্ডে বিদ্যমান! আমরা যা খাই, তা কীভাবে শরীরের ভেতরের এই সুদীর্ঘ পাইপলাইন আর এসিডের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তা দেখলে অবাক হতে হয়।
পাকস্থলী ও পাচনতন্ত্র
সবুজ ফড়িং বা ড্রাগনফ্লাই
মানুষ কঙ্কাল
মাথার ভেতরের কোষ ও স্নায়ুমণ্ডলী
মানুষের হৃদপিন্ড
গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের এই প্রদর্শনীগুলো হয়তো আমি লিখে বা ব্যাখ্যা করে শেষ করতেই পারব না। তবে একটা কথা খুব গভীর অনুভূতি থেকে বলতে পারি—বইয়ের জটিল পড়া বা সমীকরণগুলো মুখস্থ না করে, বিজ্ঞান কেন্দ্রে এসে মানুষ যখন এগুলো এভাবে নিজের চোখে দেখে, স্পর্শ করে এবং গভীরভাবে বুঝতে পারে , তখন বিজ্ঞান তাদের কাছে সহজ, আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে।এখানে এসে প্রতিটা মানুষ বুঝতে পারে তাঁদের জীবনে প্রকৃতির গুরুত্ব কতটা এবং আমাদের দেশকে মহান করতে আমাদের বিজ্ঞানীদের অবদান কতটা অনস্বীকার্য। জীবনকে অন্য নজরে দেখতে চাইলে এবং প্রকৃতির ভেতরের আসল ইঞ্জিনিয়ারিংটা বুঝতে চাইলে, জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত একবার এই বিজ্ঞান প্রাঙ্গণে ঘুরে আসা উচিত!
পাকস্থলী ও পাচনতন্ত্র
সবুজ ফড়িং বা ড্রাগনফ্লাই
মানুষ কঙ্কাল
মাথার ভেতরের কোষ ও স্নায়ুমণ্ডলী
মানুষের হৃদপিন্ড
গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের এই প্রদর্শনীগুলো হয়তো আমি লিখে বা ব্যাখ্যা করে শেষ করতেই পারব না। তবে একটা কথা খুব গভীর অনুভূতি থেকে বলতে পারি—বইয়ের জটিল পড়া বা সমীকরণগুলো মুখস্থ না করে, বিজ্ঞান কেন্দ্রে এসে মানুষ যখন এগুলো এভাবে নিজের চোখে দেখে, স্পর্শ করে এবং গভীরভাবে বুঝতে পারে , তখন বিজ্ঞান তাদের কাছে সহজ, আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে।এখানে এসে প্রতিটা মানুষ বুঝতে পারে তাঁদের জীবনে প্রকৃতির গুরুত্ব কতটা এবং আমাদের দেশকে মহান করতে আমাদের বিজ্ঞানীদের অবদান কতটা অনস্বীকার্য। জীবনকে অন্য নজরে দেখতে চাইলে এবং প্রকৃতির ভেতরের আসল ইঞ্জিনিয়ারিংটা বুঝতে চাইলে, জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত একবার এই বিজ্ঞান প্রাঙ্গণে ঘুরে আসা উচিত!
এই বিজ্ঞান কেন্দ্র সফরের সব থেকে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর অংশ—মক-আপ কোল মাইন (Mock-up Coal Mine) বা কৃত্রিম কয়লা খনি । আসামের খনি অঞ্চলের আদলে তৈরি মাটির নিচের এই রহস্যময় অন্ধকার জগতটি দেখার জন্য আমার মনে এক আলাদা কৌতুহল কাজ করছিল। এখানে মাটির নিচে আস্ত একটি কয়লা খনির অবিকল কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে। খনি শ্রমিকেরা কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে মাটির শত শত ফুট গভীরে গিয়ে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে কাজ করেন, তা জীবন্ত মডেলের মাধ্যমে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এই খনির ভেতরে এক এক করে সাজানো রয়েছে শ্রমিকদের জীবন রক্ষার নানাবিধ বৈজ্ঞানিক মেকানিজম:
ছাদ সুরক্ষার কাঠের খাঁচা (Roof Support / Timber Chocking Model): খনির ভেতরে মাটির গভীর টানেল খুঁড়ে এগোনোর সময় ওপরের ভারী পাথুরে ছাদ ধসে পড়ার এক বিরাট বিপদ থাকে। শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে এবং মাটির ছাদকে ধরে রাখতে এভাবে চারকোনা কাঠের গুঁড়ি একের পর এক সাজিয়ে শক্ত খুঁটি বা খাঁচা তৈরি করা হয়, যাকে খনির ভাষায় 'টিম্বার চকিং' বলে।
টিম্বার চকিং
উদ্ধার ও সুরক্ষা কর্নার
কয়লা টব ঠেলে ওপরে তোলার পাশাপাশি খনির ঘুটঘুটে অন্ধকার দেওয়ালে ভারী ড্রিলিং মেশিন বা জ্যাকহ্যামার চালিয়ে কয়লা কাটার যে হাড়ভাঙা খাটুনি, তা এই জীবন্ত মডেলটি দেখলে এক নিমেষে গভীর ভাবে বুঝা যায়..."
কয়লা কাটা এবং ড্রিলিং মেকানিজম
খনি শ্রমিকের নিরাপত্তা বাতি (Davy's safety Lamp): মাটির গভীর অন্ধকূপে শ্রমিকেরা যে বিশেষ হ্যারিকেন বা ল্যাম্পটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটি কোনো সাধারণ বাতি নয়। এটিকে সেফটি ল্যাম্প বলা হয়। খনির গভীরে মিথেন বা অন্য কোনো বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস লিক হলে সাধারণ আগুনের শিখায় নিমিষেই বড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এই বিশেষ ল্যাম্পের চারপাশের সূক্ষ্ম তারের জালি সেই আগুনকে বাইরে ছড়াতে দেয় না এবং বাতাসে গ্যাসের উপস্থিতি থাকলে আগুনের শিখার রঙ বদলে গিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুর হাত থেকে সতর্ক করে দেয়।
খনি শ্রমিকের নিরাপত্তা বাতি (Davy's safety Lamp)
কয়লাবাহী ট্রলি ও রেল ট্র্যাক" (Coal Tub / Mine Car Transport System)
দুই জন শ্রমিক মিলে ট্রলি ঠেলার দৃশ্য
এই প্রতিটি যান্ত্রিক মডেল আমাদের কয়লাখনি শ্রমিকদের কঠিন পরিশ্রম এবং জীবনের প্রতি মুহূর্তের ঝুঁকি কতটা মারাত্মক, সেটা খুব গভীরভাবে বুঝিয়ে দেয়।
শো টি দেখতে click করুন
লাইভ শো টিপস : এখানে খনির ভেতরের আসল আবহ এবং মেকানিজম বোঝানোর জন্য একটি চমৎকার লাইভ শো (Live Show) দেখানো হয়, যা এক কথায় অত্যন্ত রোমাঞ্চকর! তবে মনে রাখবেন, এই শো-টির জন্য বিজ্ঞান কেন্দ্রের মূল প্রবেশদ্বার (Main Entrance) থেকেই আলাদা করে টিকিট কেটে নিতে হয়।
টিকিট মূল্য: সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা।
ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ছাড়: স্কুল বা কলেজের গ্রুপ ও সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য টিকিটের মূল্য ১০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত রাখা হয়।
কঠিন বইয়ের নিরস পাতা উল্টে যা কোনোদিন মাথায় ঢুকত না, এই বিজ্ঞান কেন্দ্রের কৃত্রিম খনির অন্ধকার টানেলে হেঁটে তা এক নিমেষে আমার অন্তরে দাগ কেটে গেল।
TRAVEL GUIDE ( ভ্রমণ গাইড ) :
কি ভাবে পৌঁছাবেন : আপনি যদি গুয়াহাটি রেল স্টেশন বা পল্টন বাজার থেকে আসেন, তবে জি.এস. রোড ধরে সরাসরি খানাপাড়ার দিকে চলে আসতে পারেন। দূরত্ব মাত্র ৮-৯ কিলোমিটার। রাস্তা অত্যন্ত মসৃণ এবং সোজা। খানা পাড়া বাস স্টপ এ নেমে toto কিংবা auto করে সোজা ৫ মিনিট এ পৌছিয়ে যাওয়া যাই।
আর যদি ফ্লাইট এ আসেন, এয়ারপোর্ট থেকে সিটি বাস ও শেয়ার ট্যাক্সি (উবার/ওলা) ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যায়। আপনাকে শুধু বলতে হবে "খানাপাড়া তাজ ভিভান্তার সামনের ওভারব্রিজ"। এখান থেকে ৮-১০ মিনিট পায়ে হেটে পৌছিয়ে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যে
সময় : রবিবার থেকে শনিবার ০৯. ৩০ - ১৮. ০০
প্রবেশ মূল্য : online - 55.00
Off line - 60.00
থাকা ও খাওয়া : আশেপাশে অনেক বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল এখানে আছে
















মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন