The Riding Soldier: এক ফৌজির চোখে গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টার ও বিজ্ঞানীদের স্মৃতির সরণি

ক্যাম্পের কঠিন সামরিক শৃঙ্খলা, ভারী বুটের আওয়াজ আর অন-ডিউটি সতর্কতার চেনা গণ্ডি পেরিয়ে যখন গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের 'গার্ডেন অফ ফেমে' পা রাখলাম, তখন ফুসফুস ভরে এক অন্যরকম হাওয়া নিলাম। একজন ফৌজি জওয়ানের কাছে বিজ্ঞান মানেই তো রাডার স্ক্রিনের সিগন্যাল, জিপিএস ট্র্যাকিং বা অস্ত্রের মেকানিজম। কিন্তু বিজ্ঞান যখন কেবল ল্যাবরেটরি বা বইয়ের পাতার শুকনো সূত্র না হয়ে প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় ছায়ানিবিড় গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়, তখন তা আর কঠিন থাকে না—হয়ে ওঠে এক জ্যান্ত গল্প ।

বিশাল গাছের ছায়ায়, নীল আকাশের নিচে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা বিজ্ঞানের নানা অলৌকিক অথচ সহজ যন্ত্র গুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো—আমরা সীমান্তে বা ব্যারাকে প্রতি মুহূর্তের জীবনযুদ্ধে কত জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করি, অথচ তাদের পেছনের আসল জাদু আর ইতিহাসটা আমাদের অজানাই থেকে যায়। সায়েন্স পার্কের এই খোলা মাঠে এসে দেখলাম, বিজ্ঞানের কঠিন নিয়মগুলোকে কত সহজে চোখের সামনে রূপকথা বানিয়ে রাখা হয়েছে।

১. আরকিমিডিস স্ক্রু: (মাধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখানোর গল্প)

সামনে এগোতেই চোখে পড়ল একটি বিশাল নীল রঙের জলাধার, আর তার মধ্যে হেলানো অবস্থায় বসানো একটি প্যাঁচানো পাইপ । এটিই বিখ্যাত  Archimedes Screw।
Archimedes screw water pump model at Guwahati Science Museum outdoor park

                                                     Archimedes Screw।

মিশর ভ্রমণের সময় যখন বিজ্ঞানী আরকিমিডিস দেখলেন, নীল নদ থেকে জল তুলে উঁচু জমিতে সেচ দেওয়া চাষীদের জন্য এক খুব কষ্টের কাজ। জলকে সহজ উপায়ে নিচ থেকে ওপরে তোলার জন্য তিনি নদীর পাড়ে বসে  ভাবতে ভাবতে প্যাঁচানো স্ক্রুর মতো এই বিশেষ যন্ত্রটি নকশা করেন। যন্ত্রটির হাতল ঘোরাতেই নিচের জল ঘুরপাক খেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসতে লাগল। চোখের সামনে দেখলাম, মাধ্যাকর্ষণের শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জল কীভাবে ওপরে উঠে আসে—বিজ্ঞানের এক বাস্তব ও অনবদ্য রূপ।

Rolling Ring Fountain:  

একটু সামনেই দেখা মিলল এক বিশাল গোলাকার পাথরের রিং, যা জলের ওপর সহজেই ভেসে আছে! মনে হয় যেন টন টন ওজনের পাথরটি শূন্যে ভেসে রূপকথার জাদু দেখাচ্ছে।
Rolling ring fountain physics sculpture spinning on water flow

                                                 Rolling Ring Fountain

এটির পেছনেও জড়িয়ে আছে আরকিমিডিসের সেই বিখ্যাত "ইউরেকা" মুহূর্ত। সিরাকিউসের রাজা হাইরোর খাঁটি সোনার মুকুটে স্যাকরা খাদ মিশিয়েছে কি না, তা মুকুট না ভেঙে প্রমাণ করার দায়িত্ব পড়েছিল আরকিমিডিসের ওপর। চিন্তিত আরকিমিডিস একদিন যখন স্নানের জন্য চৌবাচ্চায় (Bathtub) নামলেন, দেখলেন তাঁর শরীরের ওজনে কিছুটা জল বাইরে গড়িয়ে পড়ল এবং নিজেকে জলে বেশ হালকা মনে হলো। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন প্লবতা বা 'Buoyancy'-র নিয়ম—জলে কোনো বস্তু ডুবালে তা নিজের আয়তনের সমান জল অপসারণ করে এবং নিচ থেকে একটি ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়। উত্তেজনায় উলঙ্গ অবস্থায় রাস্তায় দৌড়ে তিনি চিৎকার করেছিলেন—"ইউরেকা! ইউরেকা!" (আমি পেয়ে গেছি!)। জলের ওপর ভেসে থাকা বিশাল পাথরটি যেন বিজ্ঞানের সেই চিরন্তন সত্যেরই স্মারক।

  Gear System:  (গিয়ার ও চাকার সিঙ্ক্রোনাইজেশন)

এক পাগলাটে রাজার যান্ত্রিক রাজপ্রাসাদ

এরপর চোখ আটকে গেল বেশ কিছু দন্তযুক্ত চাকা এবং গিয়ারে। কোথাও দুটি বিপরীতমুখী চাকা একসাথে ঘুরছে, কোথাও বা একটি হাতল ঘোরাতেই একের পর এক চাকা সচল হয়ে উঠছে।

Interactive gear and pulley system mechanical exhibit for kids

                                                      Gear System

১২ শতকের মহান মুসলিম প্রকৌশলী আল-জাজারি (Al-Jazari)-র এই গিয়ার ও চাকা আবিষ্কারের পেছনে ছিল রাজার খামখেয়ালি চাহিদা মেটানোর মজার ইতিহাস। রাজা আল-জাজারিকে এমন কিছু বানাতে বলেন যা অতিথি দের তাক লাগিয়ে দেবে। আল-জাজারি তখন তৈরি করেন স্বয়ংক্রিয় "ময়ূর ফাউন্টেন" ও "ময়ূর পানির ঘড়ি"। অতিথি হাত ধুতে এলে যান্ত্রিক ময়ূর নিজে থেকে জল ঢেলে দিত, আবার নির্দিষ্ট সময় পর পর গিয়ারের চাকা ঘুরে বাজনা বেজে উঠত! সেই বিনোদনের খেলনা বানাতে গিয়েই জন্ম নেয় দাঁত যুক্ত চাকা (Gears), ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ও কানেক্টিং রড। একজন ফৌজি রাইডার হিসেবে আমার বাইক 'ধান্নু' (Royal Enfield)-র স্মুথ গিয়ারবক্সের থাম্পের কথা মনে পড়ে গেল—আজকের যুগের প্রতিটি গাড়ি বা বাইকের গিয়ারবক্স মূলতe আল-জাজারির সেই রাজপ্রাসাদী যান্ত্রিক ভাবনারই আধুনিক রূপ।

প্যারাবোলিক রিফ্লেক্টর: (Parabolic Reflector)

মাঠের দুই প্রান্তে রাখা দুটি বিশাল লাল রঙের ডিশ বা Parabolic Reflector। একটি ডিশের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে  ফিসফিস করে কথা বললেও, বহুদূরে থাকা অপর ডিশটিতে কান পাতলে সেই কথা স্পষ্ট শোনা যায়।

Large red parabolic reflector sound mirror dish in science park

                                                   Parabolic Reflector

প্রাচীন পারস্য ও গ্রিসে শত্রুর গোপন ষড়যন্ত্র আড়ি পেতে শোনার জন্য প্রাসাদের দেওয়ালগুলোকে এই উপবৃত্তাকার আকারে তৈরি করা হতো। এক কোণায় কেউ ষড়যন্ত্র করলে উল্টো কোণায় বসে থাকা রাজা তা অনায়াসে শুনে ফেলতেন।

ব্যারাকে ফোন বন্ধ থাকার দিনগুলোতে বা দুর্গম আউটপোস্টে যখন নেটওয়ার্ক থাকে না, তখন মানুষের হৃদয়ের সম্পর্কের বিষয়টাও কি এমন কোনো অদৃশ্য তরঙ্গে কাজ করে না? দূরত্ব হাজার মাইলের হলেও যদি অনুভূতির  সত্যি হয়, তবে হৃদয়ের ফিসফিসানিও কাঁটাতারের ওপারে থাকা প্রিয়জনের মন ছুঁয়ে যায়।

পুলি সিস্টেম: (Pulley System)

একপাশে দড়ি ও চাকার সাহায্যে তৈরি Pulley System। একটি দড়িতে টান দিয়ে ভারী পাথর তোলা যতটা কঠিন, একাধিক পুলি বা 'কম্পাউন্ড পুলি' ব্যবহার করলে ঠিক একই জিনিস সামান্য শক্তিতে ওপরে উঠে যায়।     

Pulley system mechanical advantage lift demonstration setup outdoor

                                                                      Pulley System      

রাজা হাইরো একবার আরকিমিডিসকে চ্যালেঞ্জ করেPulley Systemছিলেন কম শক্তিতে বিশাল জিনিস সরিয়ে দেখানোর জন্য। আরকিমিডিস কম্পাউন্ড পুলি তৈরি করে বন্দরের তীরে দাঁড়িয়ে, মালপত্র ও সৈন্যে ভরা এক সুবিশাল যুদ্ধজাহাজের দড়ি একাই শান্তভাবে টেনে পাড়ের দিকে নিয়ে আসেন! সেদিন স্তম্ভিত রাজার সামনে আরকিমিডিস তাঁর ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন: "আমাকে দাঁড়ানোর একটা জায়গা দাও, আর একটা লম্বা লাঠি দাও—আমি পুরো পৃথিবীটাকেই নাড়িয়ে দেব!"

মিলিটারি ট্রেনিংয়ের দিনগুলোতে  রিকভারি অপারেশনে আমরা ঠিক এই মেকানিজম ব্যবহার করি।  টিম-ওয়ার্কের শক্তিও ঠিক এই পুলির মতো—একলা জোয়ান যা তুলতে গিয়ে হিমশিম খায়, চার জোড়া হাত এক হলে তা-ই জলভাত হয়ে যায়।

পেরিস্কোপ:Periscope

১৬৫০ সালের দিকে পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী যোহানেস হেভেলিয়াস প্রথম কাচের নল দিয়ে পেরিস্কোপের প্রাথমিক রূপ দেন—মেলা বা ভিড়ে খাটো মানুষেরা যেন দূরের দৃশ্য দেখতে পায়, সেই কৌতূহল থেকে।

Yellow military periscope model installed in museum science park

                                                          Periscope


কিন্তু এই সাধারণ খেলনাটির গুরুত্ব কোটি গুণ বেড়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) ট্রেঞ্চ বা বাঙ্কার যুদ্ধে। মাটির নিচের গভীর খাদের বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা সৈন্যদের স্নাইপারদের বুলেট থেকে বাঁচাতে ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রকৌশলীরা ৪৫ ডিগ্রি কোণে দুটি আয়না বসিয়ে তৈরি করেন মিলিটারি পেরিস্কোপ। একজন ইনফ্যান্ট্রি সৈনিক হিসেবে এর গুরুত্ব আমি যেভাবে নিজের হাড় কাঁপানো অভিজ্ঞতা করি, তা কোনো সাধারণ পর্যটক হয়তো পারবে না। যা একসময় মেলার ভিড় দেখার সামান্য বস্তু ছিল, তা-ই আজ যুদ্ধের ময়দানে হাজারো ফৌজি আর সাবমেরিনের রক্ষাকবচ, আমাদের 'অদৃশ্য চোখ' হয়ে উঠেছে।

জোত্রোপ (Zoetrope): 

আজকের সিনেমা বা অ্যানিমেশনের আদি পিতা হলো Zoetrope। ক্যামেরা আবিষ্কারের আগে গণিতবিদ হর্নার স্থির ছবিকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলার কৌতূহল থেকে এই চাকার উদ্ভাবন করেন। সায়েন্স পার্কের মডেলটিতে হাতল ঘোরাতেই ছবিগুলো যেন এক নিমেষে প্রাণ পেয়ে হাসতে-খেলতে শুরু করল। বোঝা গেল, আজকের চোখধাঁধানো রূপালী পর্দার পেছনের জাদুটা আসলে কত সহজ ও সুন্দর এক ভাবনার ফসল।

Traditional zoetrope animation wheel optical illusion mechanism

                                                               Zoetrope


রোদের নরম আলো তখন গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ছে। চারপাশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে যন্ত্রগুলোর হাতল ঘোরাচ্ছে, নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখছে বিজ্ঞানকে। জীবনের শত দায়িত্ব, ইউনিফর্মের কঠোর নিয়মের কড়াকড়ি আর অন-ডিউটি ব্যস্ততার ভিড়ে গুয়াহাটি সায়েন্স সেন্টারের এই প্রাঙ্গণ আমাকে যেন আবার সেই ছোটবেলার সহজ কৌতূহলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

বন্দুক আর বুলেটের দুনিয়ায় থাকা একজন সৈনিক আজ অন্য চোখে বিজ্ঞানকে দেখল। বিজ্ঞান কেবল ল্যাবরেটরি বা ভারী বইয়ের পাতায় বন্দি কোনো বিষয় নয়—আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা, দেশের সুরক্ষা, আবেগ আর সম্পর্কের প্রতিটি পরতে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এই সহজ বার্তা। প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের এই সুন্দর সহাবস্থান আমাদের শেখায়—জীবন যত জটিলই মনে হোক না কেন, বাঙ্কারের ভেতরের অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে প্রতিটি বাধার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক সহজ ও সুন্দর সমাধানের পথ।

কর্তব্য যেমন কখনো ফুরোয় না, তেমনই জীবনের পথও কখনো শেষ হয় না!

TRAVEL GUIDE ( ভ্রমণ গাইড )     আপনি যদি রাস্তা দেখতে চান তাহলে সরাসরি click করুন এখানে https://maps.app.goo.gl/zuZLbMJpXgBF4ZSQ8?g_st=ac 

কি ভাবে পৌঁছাবেন : আপনি যদি গুয়াহাটি রেল স্টেশন বা পল্টন বাজার থেকে আসেন, তবে জি.এস. রোড ধরে সরাসরি খানাপাড়ার দিকে চলে আসতে পারেন। দূরত্ব মাত্র ৮-৯ কিলোমিটার। রাস্তা অত্যন্ত মসৃণ এবং সোজা। খানা পাড়া বাস স্টপ এ নেমে toto কিংবা auto করে সোজা ৫ মিনিট এ পৌছিয়ে যাওয়া যাই।


আর যদি ফ্লাইট এ আসেন, এয়ারপোর্ট থেকে  সিটি বাস ও শেয়ার ট্যাক্সি (উবার/ওলা) ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যায়। আপনাকে শুধু বলতে হবে "খানাপাড়া তাজ ভিভান্তার সামনের ওভারব্রিজ"। এখান থেকে ৮-১০ মিনিট পায়ে হেটে পৌছিয়ে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যে 
 
সময় : রবিবার থেকে শনিবার ০৯. ৩০ - ১৮. ০০
  
প্রবেশ মূল্য : online - 55.00
                  Off line - 60.00

 থাকা ও খাওয়া : আশেপাশে অনেক বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল এখানে আছে 

মন্তব্যসমূহ

  1. ইতিহাস জানতে বা পড়াতে বেশ ভালো লাগে, অনেক কিছু জানলাম। আগামী দিনে আপনার ব্লগে আশাকরি আরো কিছু জানবো ওশিখবো।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

The Riding Soldier: অরুণাচল প্রদেশের পরশুরাম কুণ্ড ও প্রথম পাহাড়ি রাইডের গল্প

স্বপ্নের শুরু এবং বাস্তবতার লড়াই

The Riding Soldier: উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া ও খাসি উপকথা (Part 2)