The Riding Soldier: কুয়াশার মায়া কাটিয়ে সমতলের চেনা ডেরায় (Episode 4) (GUWAHATI)

 Read this post in english 

 কর্তব্যের ডাক ও স্মৃতির কোলাহলে শেষ সকাল

কথামতোই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করিনি। চিরচেনা নিয়মানুবর্তিতা মেনে ঝটপট সেরে নিলাম বাকি থাকা সমস্ত অফিশিয়াল কাজ। এই মায়াবী মেঘের রাজ্যে আর বেশি সময় কাটানোর উপায় যে আমার নেই—নেপথ্যে বেজে উঠেছে কর্তব্যের চিরন্তন আহ্বান। তবে মনটা আজ কিছুটা ভারাক্রান্ত। কাল রাতেই যে দেখা হয়েছিল আমার বড্ড কাছের এক পুরোনো বন্ধুর সাথে! দীর্ঘ দশ বছর আগে আমরা দুজনে একসঙ্গে বুক বেঁধেছিলাম কঠোর মিলিটারি ট্রেনিংয়ের কঠিন পরিশ্রমে।

দুই বন্ধু মিলে খোলা আকাশের নিচে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পে গল্পে রাত কখন একটা ছুঁয়ে ফেলল, টেরই পাইনি। স্মৃতির ঝাঁপি খুলতেই একে একে বেরিয়ে আসছিল আমাদের ট্রেনিং লাইফের কতশত গল্প, কত মধুর অবাধ্যতা আর সোনালি দিনগুলোর অবিনাশী স্মৃতি! সব থেকে বেশি হাসাহাসি হচ্ছিল আমাদের সেই বিশেষ কীর্তিটি নিয়ে। প্রতি রবিবার যখন বাকি সবাই চুল কাটা কিংবা কাপড় কাচায় ব্যস্ত থাকত, তখন আমরা দুজনে চোরের মতো ট্রেনিং সেন্টারের দেয়াল টপকে, এয়ারপোর্টের ভেতর দিয়ে ক্যানেল পার হয়ে চলে যেতাম স্থানীয় মার্কেটে ঘুরে বেড়াতে। ঠিক দুপুরের রোল-কল বা চেকিং হওয়ার আগেই আবার ড্রেস চেঞ্জ করে সুবোধ বালকের মতো লাইনে এসে দাঁড়িয়ে যেতাম। কিন্তু বিধি বাম! একদিন আমরা হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলাম কর্তব্যরত সিআইএসএফ (CISF) জোয়ানের হাতে। সে তো সটান আমাদের সেন্টারে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিল। মজার বিষয় হলো, সে যাত্রায় আমরা ছাড়া বাকি সবাই চরম শাস্তি পেয়েছিল, কারণ আমরা চালাকি করে নিজেদের আসল নামটাই বলিনি!

এরপরই আলোচনায় উঠে এলো নাইট ফায়ারিং (Night Firing) ফাইনাল টেস্টের সেই রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। সেবার আমাদের এক বন্ধু টার্গেট মিস করায় ফেল করার উপক্রম হয়েছিল। আমরা দুজনে পকেটে পেন্সিল লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং গোপনে তার টার্গেট পেপার ফুটো করে দিয়েছিলাম যাতে সে পাস করে যায়। কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হলো না; আমরা দুজনেই ধরা পড়ে গেলাম এবং শাস্তি হিসেবে সারারাত জেগে কঠিন সাজা ভোগ করতে হয়েছিল। এই সব খুনসুটি আর নস্টালজিয়ার সাগরে ভাসতে ভাসতে কখন রাত একটা বেজে গেল বুঝতেই পারিনি। অতঃপর ভারী মন আর এক বুক তৃপ্তি নিয়ে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

বিদায় শিলং, ধন্নুর গর্জন আর পথের মায়া

পরদিন সকালে আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধন্নু'-র হ্যান্ডেলবারে হাত রাখতেই এক অদ্ভুত শিহরণ ও রোমাঞ্চ শরীরে খেলে গেল। মেঘে ঢাকা সকালের ঘন কুয়াশা ভেদ করে ধন্নুর সেই চেনা গম্ভীর গর্জন পাহাড়ি উপত্যকায় প্রতিধ্বনি তুলল। রূপালি মেঘের শহর শিলংকে পেছনে ফেলে, একরাশ অধরা স্মৃতি বুকে চেপে আমি আবার স্টার্ট দিলাম। আমার গন্তব্য এবার সমতলের চিরচেনা কর্মব্যস্ত শহর গুয়াহাটি।

যাওয়ার সময় যে পথ দু-হাত বাড়িয়ে আমায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, আজ ফেরার পথে সেই চেনা রাস্তাগুলোই যেন এক গভীর, গম্ভীর ও বিষাদগ্রস্ত রূপ নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। রয়্যাল এনফিল্ডের থাম্পিং আওয়াজটাও আজ যেন বিদায়ের সুরে কিছুটা ভারী হয়ে উঠেছে। যাওয়ার পথে যে মসৃণ পিচ রাস্তা প্রজাপতির ডানার মতো মেলে আমায় আপন করে বরণ করেছিল, আজ বিদায়বেলায় সেও যেন অভিমানে মুখ ভার করে আছে। দু-পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন সবুজ পাইন বন, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আলতো করে জমে থাকা হালকা সাদা মেঘের ভেলা, আর দূর থেকে ভেসে আসা পাহাড়ি ঝরনার রিনিঝিনি শব্দ—সব মিলিয়ে চার পাশে এক স্বর্গীয় ও মায়াবী আবহ তৈরি হয়েছিল।

যে অপরূপ প্রাকৃতিক ক্যানভাস আসার পথে আমার চোখ জুড়িয়েছিল, ফেরার পথে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে মনের ভেতরটা কেমন যেন উদাস আর অশান্ত হয়ে উঠল। পাহাড়ি বিপজ্জনক বাঁকগুলোতে যখন আমার ধন্নু হালকা হেলে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ঠান্ডা কনকনে বাতাস আমার হেলমেটের ভাইজার ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলছিল—"নাই বা গেলে আমায় এভাবে অসম্পূর্ণ রেখে!"

উমিয়ামের নীরব আহ্বান 

ঠিক তখনই আমার মনে হলো—রাস্তায় দু-ধারে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওই বিশাল পাইন গাছগুলো আর সুদূর বিস্তৃত উমিয়াম লেকের শান্ত জলরাশি যেন আমার কানের কাছে এসে আকুল আকুতি জানাচ্ছে। বাতাসে পাতা দোলার মর্মর ধ্বনিতে তারা যেন আমায় জড়িয়ে ধরে বলছিল, "আরেকটু থেকে যাও না! আর কিছুটা মুহূর্ত অন্তত আমাদের এই কোলে কাটিয়ে যাও..."

প্রকৃতির সেই নীরব ও মায়াবী আহ্বান আমি কোনোভাবেই এড়াতে পারছিলাম না। বাতাসে বয়ে চলা প্রতিটা সুর, পাইন বনের দীর্ঘশ্বাস আর মায়াবী উমিয়াম হ্রদের শান্ত জলরাশির ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিটা নীরব দুঃখ যেন আমি আমার অন্তরের অন্তস্তলে অনুভব করতে পারছিলাম। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, প্রকৃতির এই নিঝুম একাকীত্ব আর আমার ফৌজি জীবনের চরম ব্যস্ততা—কোথাও যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। দুজনেই কত আপন, অথচ কত একাকী!

নংপো (Nongpoh) শহরের সেই চেনা মোড়, দূর থেকে দেখা উমিয়ামের সেই শান্ত নীল জলরাশির মায়া—সবকিছুকে তাই শেষবারের মতো চোখ ভরে, মন ভরে দেখে নিচ্ছিলাম। পাহাড়ের এই অনাবিল, ঐশ্বরিক সৌন্দর্য আর বিদায়ের এই করুণ সুর একজন ক্লান্ত রাইডারের সব ক্লান্তি এক নিমেষে শুষে নেয় ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক অদ্ভুত, মায়াবী নস্টালজিয়া এঁকে দিয়ে যায়।

সমতলের বুকে ফেরা ও মেঘালয় ডায়েরির ইতি

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উতরাই এবং রোমাঞ্চকর পথ শেষ করে যখন আমি সমতলের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন দুপুরের চড়া রোদ ম্লান হয়ে এসেছে। বিকেলের এক নরম, মায়াবী সোনালি আলোয় চারপাশ ছেয়ে গেছে। দূর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার আর্দ্র বাতাস আমায় ফিসফিস করে জানান দিচ্ছিল—আমি গুয়াহাটির খুব কাছে চলে এসেছি।

অবশেষে বিকেল নাগাদ আমি এসে পৌঁছালাম আসামের প্রবেশদ্বার, চেনা এবং চিরপরিচিত কর্মব্যস্ত শহর গুয়াহাটিতে। পাহাড়ের সেই মাদকতাময় নিস্তব্ধতা আর কুয়াশার চাদর কাটিয়ে যখন গুয়াহাটির চেনা কোলাহল, চেনা ট্রাফিক আর ব্যস্ত রাস্তার মাঝে আমার ধন্নুর চাকা থমকে দাঁড়াল, তখন মনের ভেতর এক অদ্ভুত মানসিক তৃপ্তি কাজ করছিল। দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর পাহাড়ি অ্যাডভেঞ্চার শেষ করে নিজের চেনা ডেরায়, নিজের চেনা আশ্রয়ে ফিরে আসার আনন্দটাই সম্পূর্ণ আলাদা। ধন্নুর বডিতে লেপ্টে থাকা পাহাড়ের লালচে ধুলোবালি যেন আমার এই সফল এবং রোমাঞ্চকর সফরের এক নীরব, বিশ্বস্ত সাক্ষী হয়ে রইল।

আজকের এই চমৎকার, শান্ত বিকেলটার সাথে সাথেই শেষ হলো আমার স্মৃতির পাতায় মোড়া 'মেঘালয় ডায়েরি'। কিন্তু একজন রাইডারের জীবন তো একটা ডায়েরিতেই থমকে যায় না! গুয়াহাটির বুকে কাটানো আগামী দিনগুলো এবং এই শহরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক অজানা গল্প নিয়ে খুব শীঘ্রই ফিরছি পরবর্তী কোনো পর্বে।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


                                                     **ফৌজি ডায়েরি থেকে:** 
    আমি পেশায় একজন ভারতীয় সেনা জওয়ান (Indian Army Jawan) এবং নেশায় একজন সোলো মোটো-ব্লগার। কর্মজীবনের কঠোর ডিসিপ্লিন আর দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার ডিউটির ফাঁকে, যখনই সময় পাই, হেলমেট মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-র পিঠে চড়ে। এই ডায়েরিতে আমি মূলত একজন ফৌজির চোখে দেখা ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অফবিট ট্রাভেলের খাঁটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। পথ কখনো শেষ হয় না... জয় হিন্দ! 🪖🏍️🇮🇳

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

The Riding Soldier: অরুণাচল প্রদেশের পরশুরাম কুণ্ড ও প্রথম পাহাড়ি রাইডের গল্প

স্বপ্নের শুরু এবং বাস্তবতার লড়াই

The Riding Soldier: উমিয়াম হ্রদের শান্ত মায়া ও খাসি উপকথা (Part 2)