The Riding Soldier: শিলং পুলিশ বাজারের ট্রাফিক ও গরম মোমো (Part 3)
উমিয়াম হ্রদ আমার মনের গভীরে এক অদ্ভুত দাগ কেটে গেল। এক স্বর্গীয় উপকথা আর পাহাড়ের এক নীরব দীর্ঘশ্বাসের এক মিশ্র অনুভূতি বুকে চেপে আমি আমার 'ধন্নু'-কে আবার স্টার্ট দিলাম। বিকেলের আলো তখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। উমিয়াম হ্রদের ধার থেকে যখন আমি সামনের দিকে এগিয়ে চললাম, তখন বুকটা এক অজানা মায়ায় ভারী হয়ে উঠছিল। কিন্তু এক জায়গায় খুব বেশি সময় থমকে দাঁড়ানোর উপায় নেই। তাই অতি ভারী মন নিয়েই আমি আবার এক্সিলারেটরে মোচড় দিলাম, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি পথ চিরে আমার গন্তব্য—মেঘের রানী 'শিলং' শহরের দিকে।
আমি যখন শিলং-এর মূল শহরে প্রবেশ করলাম, ততক্ষণে চারপাশ জুড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আর সেই সন্ধ্যার হাত ধরে ধেয়ে এলো পাহাড়ি ঘন কুয়াশার এক বিশাল চাদর। পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস যেন রাইডিং গিয়ার ভেদ করে শরীরে কাঁটা দিচ্ছিল। সেই ঘন সাদা কুয়াশা ভেদ করে সাবধানে বাইক চালিয়ে আমি এসে পৌঁছালাম শিলং-এর প্রাণকেন্দ্র—'পুলিশ বাজার'-এ।
সেখানকার পরিবেশটা ছিল দেখার মতো। একদিকে পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে ট্যাক্সি আর গাড়ির চেনা জ্যাম, কুয়াশার মধ্যে হেডলাইটের আলোগুলো যেন জোনাকির মতো জ্বলছিল। কিন্তু এই তীব্র জ্যামের মধ্যেও একটা জিনিস আমার নজর কাড়ল—সেখানকার ট্রাফিক পয়েন্টগুলো! ট্রাফিক পয়েন্টের প্রতিটি পুলিশ এবং গাড়ি চালক অসম্ভব ডিসিপ্লিন বা সুশৃঙ্খল।
আমি যখন মনে মনে আমার নিজের রাজ্যের ট্রাফিক এবং সাধারণ মানুষের ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলার সাথে এখানকার তুলনা করলাম, তখন সত্যি আমার মাথায় আসলো আমাদের রাজ্যের ট্রাফিক ব্যবস্থার সেই কঙ্কালসার অবস্থাগুলো! যেখানে আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে শিলংয়ের এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা দেখে সত্যি মনটা ভরে গেল। কেউ নিয়ম ভাঙছে না, কেউ অহেতুক হর্ন বাজাচ্ছে না—অত্যন্ত শান্ত ও সুশৃঙ্খলভাবে ট্রাফিক সামলানো হচ্ছে।
পুলিশ বাজারের সেই সুশৃঙ্খল ট্রাফিকের জ্যাম পেরিয়ে আমি যথারীতি আমার নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছালাম এবং রুমে গিয়ে উঠলাম। সারাদিনের গুয়াহাটি থেকে নোংপো, উমিয়াম হয়ে শিলং পর্যন্ত দীর্ঘ পাহাড়ি রাস্তায় অনবরত রাইডিং-এর ক্লান্তিতে শরীর তখন যেন ভেঙে আসছিল। তার ওপর বাইরের ওই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা—সব মিলিয়ে মনটা একটু উষ্ণতা খুঁজছিল।
খানিকটা ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যাবেলা যখন কুয়াশায় মোড়া সেই ঠাণ্ডা শহরের রাস্তায় পা বাড়ালাম, তখন চারপাশের ধোঁয়া ওঠা দোকানগুলো থেকে আসা সুস্বাদু খাবারের এক দারুণ সুবাস মনকে চাঙ্গা করে তুলল। এই পাহাড়ি আবহাওয়ায় লোভ সামলানো দায়! তাই ঝটপট একটা স্থানীয় দোকানে ঢুকে অর্ডার করে দিলাম এক প্লেট গরম গরম মোমো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সামনে চলে এলো একটি কালো লম্বাটে প্লেট। তাতে সুন্দর করে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ধোঁয়া ওঠা ধবধবে সাদা চারটি মোমো, আর ঠিক মাথার কাছে রাখা জিভে জল আনা টকটকে লাল রঙের ঝাল চাটনি! পাশে রাখা একটা স্টিলের কাঁটা চামচ।
শিলং-এর সেই কুয়াশা ভরা সন্ধ্যায়, কনকনে ঠান্ডার মধ্যে কাঁটা চামচ দিয়ে মোমোটা তুলে চাটনিতে ডুবিয়ে যখন মুখে দিলাম—প্রতিটা কামড়ে যেন এক স্বর্গীয় সুখ লুকিয়ে ছিল! ভেতরের গরম জুসি পুর আর বাইরের পাতলা আস্তরণটি চাটনির ঝালের সাথে মিশে এক ম্যাজিক তৈরি করেছিল। এই সাধারণ খাবারটাই যেন একজন ক্লান্ত রাইডারের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল। শরীর ও মন দুই-ই যেন নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠল পরবর্তী সফরের জন্য।
এক অধরা প্রেম:
মোমো খাওয়া শেষ করে আমি যথারীতি ফিরে এলাম আমার রুমে। জানলা দিয়ে বাইরের কুয়াশায় ঢাকা শিলং শহরের পাহাড়ি আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে মনের ভেতর একটা নস্টালজিয়া দানা বাঁধছে। আজকের দিনটা আমার এখানেই শেষ হলো। হয়তো কাল সকালেই আমাকে আমার সব কাজ কমপ্লিট করে আবার চেনা হাইওয়ে ধরে ফিরে যেতে হবে।
মনটা খুব খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, এই শিলংকে সম্পূর্ণভাবে না দেখেই, কেমন যেন একটা 'অধুরা' বা অসম্পূর্ণ অনুভূতি নিয়ে আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে। এই পাহাড়ের পাইন বন, আঁকাবাঁকা পথ আর মেঘেদের সাথে গল্প করার আরও অনেক কিছু বাকি রয়ে গেল। তবে মনকে বোঝালাম, যে গল্প অসম্পূর্ণ থাকে, সেখানেই তো আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতির জন্ম হয়! পূর্ণতার চেয়ে এই অপূর্ণতার সৌন্দর্য বোধহয় অনেক বেশি তীব্র। কারণ যা সম্পূর্ণ, তা তো ওখানেই শেষ; আর যা অসম্পূর্ণ, তা মনের ভেতর এক চিরন্তন ব্যাকুলতা আর চেনা টান টিকিয়ে রাখে।
একজন ফৌজি জওয়ানের জীবনটাও তো ঠিক এমনই—একটার পর একটা অসম্পূর্ণ গল্পের কোলাজ। আজ এখানে ডিউটি তো কাল অন্য কোনো সীমান্তে; কোথাও মন টিকিয়ে রাখার বা মায়ায় জড়ানোর ফুরসতটুকু আমাদের বড্ড কম। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত অপূর্ণতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ভালোলাগা। শিলংয়ের এই কুয়াশা ঘেরা মায়াবী শহরটাকে আজ পুরোটা দেখা হলো না ঠিকই, কিন্তু এই অধরা থেকে যাওয়াটাই আমার চাকা-দুটিকে আবার একদিন এই পাহাড়ি রাস্তায় ফিরিয়ে আনবে। কর্তব্য আজ আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে সমতলের দিকে, কিন্তু স্মৃতির ডায়রিতে শিলংয়ের এই পাতাটি চিরকাল এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চ হয়েই রয়ে যাবে।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
**ফৌজি ডায়েরি থেকে:**
আমি পেশায় একজন ভারতীয় সেনা জওয়ান (Indian Army Jawan) এবং নেশায় একজন সোলো মোটো-ব্লগার। কর্মজীবনের কঠোর ডিসিপ্লিন আর দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার ডিউটির ফাঁকে, যখনই সময় পাই, হেলমেট মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমার প্রিয় রয়্যাল এনফিল্ড 'ধান্নু'-র পিঠে চড়ে। এই ডায়েরিতে আমি মূলত একজন ফৌজির চোখে দেখা ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অফবিট ট্রাভেলের খাঁটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। পথ কখনো শেষ হয় না... জয় হিন্দ! 🪖🏍️🇮🇳



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন