The riding soldier: গুয়াহাটির ঐতিহ্যবাহী খানাপাড়া ফুট ওভারব্রিজ দেখার অভিজ্ঞতা
মেঘের রাজ্য শিলংয়ের সেই কুয়াশামাখা মায়াবী দীর্ঘশ্বাস আর পাইন বনের উদাস করা বিদায়লিপি বুকে নিয়ে যখন আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী 'ধন্নু'-র এক্সিলারেটরে শেষ টান দিয়েছিলাম, তখনো ভাবিনি সমতলের প্রবেশদ্বার আমার জন্য এমন এক অবিস্মরণীয় বিস্ময় সাজিয়ে রেখেছে। পাহাড়ের খাড়া উতরাই আর আঁকাবাঁকা বিপজ্জনক বাঁকগুলো পেরিয়ে যখন সমতলের বুক চিরে পিচ ঢালা সোজা রাস্তায় এসে পৌঁছালাম, ঠিক তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অপূর্ব দৃশ্যপট। স্বাগত হে গুয়াহাটি!
শহরের ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার খানাপাড়া (Khanapara) এলাকায় পৌঁছানোমাত্রই আমার নজর কেড়ে নিল জি.এস. রোডের ওপর সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য ফুট ওভারব্রিজ। দূর থেকে প্রথম দর্শনেই মনে হলো, কোনো কৃত্রিম কংক্রিটের জঙ্গল নয়, যেন স্বয়ং আসামের চিরন্তন প্রকৃতি দুহাত বাড়িয়ে এক ক্লান্ত ফৌজি রাইডার আর তার দুই চাকার স্বপ্নকে পরম উষ্ণতায় আলিঙ্গন করার জন্য অপেক্ষা করছে। ধন্নুর গতি কিছুটা ধিমে করে হেলমেটের ভাইজারের ভেতর থেকে যখন সেতুটির দিকে তাকালাম, বুকের ভেতর এক অন্যরকম মুগ্ধতা আছড়ে পড়ল।
ঐতিহ্যের সুক্ষ্ম বুনন
আমি জানতাম আসামের সবুজ বুক জুড়ে লুকিয়ে আছে ভারতের বৃহত্তম বাঁশের ভাণ্ডার। এও জানতাম যে অসমীয়া সংস্কৃতির প্রতিটি পরতে—মাথার ঐতিহ্যবাহী 'জাপি' টুপি থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবনের মাছ ধরার পলো, ঘরের মাচান কিংবা নিত্যদিনের তৈজসপত্র—সবকিছুতেই বাঁশ এক অবিচ্ছেদ্য এবং পবিত্র অংশ। কিন্তু আধুনিক নাগরিক পরিকাঠামোর এই ব্যস্ত রাজপথে, লোহার কাঠামোর ওপর এমন জীবন্ত এক ঐতিহ্যবাহী ওভারব্রিজ তৈরি করা সম্ভব, তা সত্যিই নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন!
সেতুটির বাহ্যিক কাঠামো বা ক্ল্যাডিংয়ে বাঁশের যে সুক্ষ্ম কারুকার্য ও বুননশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে, তা চোখের পলক স্তব্ধ করে দেয়। গ্রামীণ স্থাপত্যের প্রাচীন রূপ এবং বিশেষ করে মিসিং উপজাতির ঐতিহ্যবাহী 'চ্যাং ঘর'-এর (Mising Chang Ghar) কাঠের ও বাঁশের মাচানের সেই চিরন্তন বুনন যেন এখানে এসে এক আধুনিক শিল্পের রূপ পেয়েছে। নাগরিক যান্ত্রিকতার বুকে এ যেন এক টুকরো সবুজ অর্থনীতি এবং কুটির শিল্পের বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত হওয়ার গৌরবগাথা। ধন্নুর ইঞ্জিনের গম্ভীর আওয়াজের সাথে সাথে আমার মনের ভেতর তখন আসামের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক নীরব বন্দনা বেজে উঠছিল।
Khanapara Bamboo Foot Overbridge Guwahati
এই প্রবেশ দ্বারটি কেবল আমার মনকে আকর্ষিতই করেনি, প্রকৃতি বোধহয় আমার এই মুগ্ধতার পুরস্কার দিতেই এক চমৎকার সুযোগ এনে দিল। একটু পরেই জানতে পারলাম, আমার গন্তব্য এবং আগামী দুই সপ্তাহের আস্তানা বা ফৌজি ক্যাম্পটি এই ঐতিহাসিক খানাপাড়ার বুকেই অবস্থিত! মনের ভেতর আনন্দের এক বিশাল জোয়ার বয়ে গেল। শুধু এই সুন্দর তোরণটিকে রোজ দেখার সুযোগই নয়, আগামী দুটি সপ্তাহ জুড়ে এই প্রাচীন এবং প্রাণবন্ত গুয়াহাটি শহরটাকে মন ভরে উপভোগ করার, চিনে নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ আমার সামনে। সাথে সেনাবাহিনীতে আমার কিছু জরুরি অফিশিয়াল ক্লাস ও ট্রেনিং ছিল, সেগুলোকেও এই দুই সপ্তাহে সম্পূর্ণ করতে হবে। এক বুক অপার শান্তি আর আত্মহারা আনন্দ নিয়ে আমি ধন্নুকে নিয়ে প্রবেশ করলাম আমাদের ক্যাম্পে।
যখন সন্ধ্যা নামল, তখন নিজেকে আর ঘরের চার দেওয়ালে আটকে রাখতে পারলাম না। বিকেলের নরম আলো মুছে গিয়ে যখন গুয়াহাটির আকাশে রাতের মায়াবী অন্ধকার ডানা মেলছে, তখন এই বাঁশের সেতুটির আলোকোজ্জ্বল রূপ দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
সেতুটির ওপরে যখন গিয়ে দাঁড়ালাম, চারপাশের দৃশ্যপট এক নিমেষে বদলে গেল। নিচে জি.এস. রোডের বুকে তখন যান্ত্রিক সভ্যতার তীব্র কোলাহল—গাড়ির হেডলাইটের আলো যেন এক অবিরাম আলোর নদী হয়ে বয়ে চলেছে, কানে আসছিল চেনা শহরের চঞ্চল গুঞ্জন ও হর্নের আওয়াজ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাঁশের আবরণের ভেতরে দাঁড়িয়ে মনের ভেতর এক অদ্ভুত, অলৌকিক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। নিচের কোলাহল যেন এই ঐতিহ্যের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শান্ত এক সুর হয়ে আসছিল।
Khanapara Bamboo Foot Overbridge Guwahati
সেতুটির চারপাশের প্রকৃতির রূপ তখন রাতের আলোয় এক মায়াবী ক্যানভাস তৈরি করেছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের আবছা কালো রেখা, আর মাথার ওপর মেঘমুক্ত আকাশে দু-একটি নক্ষত্রের উঁকিঝুঁকি। আর এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে তাল মিলিয়ে চারপাশের আধুনিকতাও যেন নিজের রূপের ডালি সাজিয়ে বসেছে। সেতুর ঠিক বিপরীতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল 'তাজ ভিভান্তা'-র মতো বড় বড় আধুনিক ইমারত। তাদের কাঁচের দেওয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছিল শহরের রঙিন নিয়ন আলো। একপাশে আদিম প্রকৃতির শান্ত রূপ, আর অন্যপাশে আধুনিক নাগরিক সভ্যতার চোখধাঁধানো জাঁকজমক—এই দুইয়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি,
বাঁশের বুননের ফাঁক গলে আসা রাতের শীতল হাওয়া যখন আমার ক্লান্তি ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হলো—এই দুই সপ্তাহের গুয়াহাটি ডায়েরি আমার জীবনের এক নতুন এবং সুন্দর অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। শহরের এই আলো-আঁধারির মায়ায় ডুব দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ডায়েরির পাতায় শুধু এইটুকুই লিখলাম, "পথ কখনো শেষ হয় না, সে শুধু এক রূপ থেকে অন্য রূপে আমাদের বাঁচতে শেখায়।"..
কীভাবে যাবেন এই ঐতিহ্যবাহী খানাপাড়া ওভারব্রিজে? (Travel Guide)
লোকেশন: জি.এস. রোড (G.S. Road), খানাপাড়া, গুয়াহাটি। এটি ঠিক বিখ্যাত পাঁচতারা হোটেল 'তাজ ভিভান্তা' (Taj Vivanta)-র বিপরীতে অবস্থিত।
বাইক বা গাড়িতে (সমতল থেকে): আপনি যদি গুয়াহাটি রেল স্টেশন বা পল্টন বাজার থেকে আসেন, তবে জি.এস. রোড ধরে সরাসরি খানাপাড়ার দিকে চলে আসতে পারেন। দূরত্ব মাত্র ৮-৯ কিলোমিটার। রাস্তা অত্যন্ত মসৃণ এবং সোজা।
শিলং বা জোয়াই থেকে (পাহাড়ি রুট): আমার মতো যাঁরা শিলং বা মেঘালয় থেকে রাইড করে ফিরছেন, তাঁরা এনএইচ ৪০ (NH 40) শেষ করে গুয়াহাটি শহরে ঢোকার মুখেই হাতের বাঁদিকে এই তোরণটি দেখতে পাবেন। আসামে প্রবেশের এটিই প্রধান ল্যান্ডমার্ক।
বাস বা লোকাল ট্রান্সপোর্ট: গুয়াহাটি শহরের পল্টন বাজার, গণেশগুড়ি বা আইএসবিটি (ISBT) থেকে খানাপাড়া যাওয়ার সিটি বাস ও শেয়ার ট্যাক্সি (উবার/ওলা) ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যায়। আপনাকে শুধু বলতে হবে "খানাপাড়া তাজ ভিভান্তার সামনের ওভারব্রিজ"।
সেরা সময়: দিনের বেলা এই সেতুর বাঁশের বুনন এবং স্থাপত্যের নিখুঁত কাজ খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। তবে আমি বলব, সম্ভব হলে সন্ধ্যার পর আসুন। কারণ রাতে যখন সেতুর নিয়ন আলো এবং নিচের গাড়ির হেডলাইটের মেলা বসে, তখন এর রূপ সত্যিই দেখার মতো হয়।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন