The Riding Soldier: গুয়াহাটি আঞ্চলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র ও বিজ্ঞানীদের স্মৃতির সরণি
আঞ্চলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র' (Regional Science Centre, Guwahati)।
একদিন ক্লান্তি জড়ানো পায়ে হেঁটে রওনা হলাম সেই বিজ্ঞান মিউজিয়ামের উদ্দেশ্যে। যান্ত্রিক শহরের চেনা কোলাহল আর হর্নের তীব্র আওয়াজ পেরিয়ে যখন মিউজিয়ামের মূল তোরণ দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম, এক লহমায় চারপাশের চঞ্চলতা যেন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল। চারদিকে আদিগন্ত সবুজ গাছপালা আর এক অদ্ভুত শান্তিময় পরিবেশ, যা মনের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই পরম মমতায় ধুয়ে মুছে দিল।
হাঁটতে হাঁটতে আমি এসে পৌঁছালাম মিউজিয়ামের বাইরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে থাকা বিখ্যাত ‘গার্ডেন অফ ফেম’ (Garden of Fame)-এ। নিবিড় সবুজের বুকে এখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের বিজ্ঞানচর্চাকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করা মহান মনীষীদের আবক্ষ মূর্তিগুলো। আর সেখানে যেতেই আমার চঞ্চল চোখ দুটি থমকে গেল বাঙালি তথা আপামর ভারতবাসীর চিরন্তন গর্ব—কিংবদন্তি বিজ্ঞানী আচার্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর মূর্তির সামনে।
আচার্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু
মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত আবেগ বুকের ভেতর চাড়া দিয়ে উঠল। ইনিই তো সেই যুগান্তকারী মানুষ, যিনি বিশ্বমঞ্চে প্রথম বুক ঠুকে প্রমাণ করেছিলেন—"উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে!" আমাদের মতোই তাদেরও সুখ-দুঃখ আছে, আছে অনুভূতির এক গোপন জগত। এই আসামের দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগানের যে সবুজ চারাগাছগুলো বুক ফুলিয়ে হাসে, তাদের সেই বেড়ে ওঠার নীরব ভাষা তো প্রথম এই মানুষটিই পৃথিবীকে বুঝিয়েছিলেন। চারপাশের গাছের পাতা ভেদ করে আসা বিকেলের মিঠে হাওয়া যেন আজও এই মহান বিজ্ঞানীর চেনা স্পর্শের বন্দনা গাইছিল। গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলে দুলে যেন ফিসফিস করে বলছিল—"হে মহর্ষি, তুমি ছিলে বলেই হয়তো মানুষ আজ বুঝতে পেরেছে যে আমাদের বুকেও স্পন্দন আছে, আমাদেরও প্রাণ আছে!"
জগদীশ চন্দ্র বসুর সেই প্রকৃতির দর্শন থেকে মাত্র কয়েক কদম এগোতেই আমি মুখোমুখি হলাম আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আরেক জাদুকর—অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মূর্তির সামনে। চশমা পরা, চুলে নিখুঁত ব্যাকব্রাশ করা সেই চিরপরিচিত গম্ভীর অথচ মায়াবী মুখের সাথে যখন চোখ মিলল, মনের ভেতর এক গভীর শ্রদ্ধাবোধের ঢেউ আছড়ে পড়ল।
অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু
বিজ্ঞানের ছাত্র না হলেও, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম শোনেনি এমন ভারতীয় মেলা ভার। মূর্তির নিচের বেদিতে খোদাই করা অসমিয়া ও ইংরেজি লেখাগুলোর ওপর চোখ বোলাতেই এক অনাবিল গর্বে বুকটা ভরে উঠল। আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যিনি তৈরি করেছিলেন ‘বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’, যার অমলিন সম্মানে মহাবিশ্বের এক শ্রেণীর মৌলিক কণার নাম রাখা হয়েছে ‘বোসন’ (Boson) কণা! মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো—শুধু সীমান্তে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে দেশের নাম উজ্জ্বল করাই একমাত্র কর্তব্য নয়, এই মানুষগুলোও তাঁদের অসামান্য মেধা আর কলমের জোরে ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য ভেদ করে দেশের পতাকাকে বিশ্ব-আকাশের সবার ওপরে তুলে ধরেছিলেন।
বীরবল সাহানি
মূর্তির নিচে খোদাই করা তাঁর জীবন ও কাজের ইতিহাসের ওপর যখন চোখ বোলালাম, তখন বুঝতে পারলাম কেন তাঁকে ভারতের 'প্রত্ন-উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক' বলা হয়। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা মাটির ওপরের সবুজ গাছপালা আর ফুলের সুবাস দেখেই মুগ্ধ হই। কিন্তু অধ্যাপক বীরবল সাহানি ছিলেন সেই দূরদর্শী ক্রান্তদর্শী বিজ্ঞানী, যিনি মাটির গভীরে, পাথরের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা কোটি কোটি বছরের প্রাচীন উদ্ভিদের জীবাশ্ম বা 'ফসিল' (Fossils) নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে নিরেট পাথর কেবলই জড় বস্তু নয়, তার বুকেও প্রাচীন পৃথিবীর জন্মলগ্নের আদিম উদ্ভিদের স্পন্দন ও ইতিহাস ঘুমিয়ে থাকে।
এখানে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই একটা গভীর জীবনদর্শন খুঁজে পেলাম। আমাদের জীবন কাটে দেশের মাটির ওপরে, সীমানা পাহারা দিয়ে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করায়; আর এই বিজ্ঞানী তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সেই মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ভারতের প্রাচীন ভৌগোলিক ইতিহাসকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে। ক্যামব্রিজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এই মানুষটি ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ভিতকে কতটা মজবুত করে গেছেন, তা তাঁর লখনউয়ের 'বীরবল সাহানি ইনস্টিটিউট'-এর অবদান না জানলে অনুধাবন করা অসম্ভব। আসামের যে মাটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এই মাটির বুকেও তো লুকিয়ে আছে কত শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস, খনিজ তেল আর কয়লার খনি—যা আসলে কোটি কোটি বছর আগের জীবাশ্মেরই রূপান্তর। বীরবল সাহানি যেন এই মূর্তির মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আমরা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আজ বুক ফুলিয়ে বাঁচি, সেই মাটির নিচের প্রতিটি পাথর আর স্তর আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাসের সাক্ষী।
বিজ্ঞান উদ্যানের ছায়াময় পথ ধরে একে একে ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার রথী-মহরথীদের স্মৃতির সরণি পেরিয়ে আমি যখন আরও কিছুটা সামনে এগোলাম, তখনই চোখে পড়ল সংখ্যার জাদুকর ‘শ্রীনিবাস রামানুজন’-এর মূর্তির দিকে। ইনি সেই বিরল মানুষ, যাঁর কাছে সংখ্যাগুলো কোনো জ্যামিতিক বা যান্ত্রিক খসড়া ছিল না; প্রতিটি সংখ্যা ছিল এক একটি জীবন্ত অনুভূতি, ঈশ্বরের এক একটি সুন্দর প্রকাশ!
শ্রীনিবাস রামানুজন
মেধার সীমানা যে কত অসীম আর বাঁধনহারা হতে পারে, তা এই মানুষটিকে দেখে আমাদের শেখا দরকার। কোনো বড় ডিগ্রি বা প্রথাগত উচ্চশিক্ষা ছাড়াই, দক্ষিণ ভারতের এক সাধারণ অতি-দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে এই মানুষটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া ‘রামানুজন প্রাইম’, ‘রামানুজন থিটা ফাংশন’ কিংবা ইনফিনিট সিরিজ আজও আধুনিক গণিত ও মহাবিশ্বের এক পরম রহস্য। তিনি চরম দারিদ্র্য ও ভাঙা শরীরের মতো কঠিন পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে কেবল নিজের অদম্য ইচ্ছা আর মেধার জোরে বিশ্বমঞ্চে দেশের গৌরবকে সগর্বে উড়িয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সুযোগের অভাব কখনো আসল প্রতিভাকে চেপে রাখতে পারে না।
মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আমি এক অদ্ভুত আত্মিক মেলবন্ধন খুঁজে পাচ্ছিলাম। আমাদের দৈনন্দিন কর্মজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত চলে এক নিখুঁত হিসাব আর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে—আর রামানুজন সেই নিখুঁত শৃঙ্খলার পরম সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন সংখ্যার ভেতর।
এই ফ্রেমের সব থেকে শেষে যে মূর্তিটি ছিল, যাঁর দিকে তাকালে আজ প্রতিটি দেশবাসী বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে এবং রক্ষাকর্তাদের বুকে এক অফুরন্ত অন্তহীন শক্তি জোগান দেয়—তিনি হলেন ভারতের পরমাণু শক্তির জনক ডক্টর হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। আজ যে দেশ পরমাণু প্রযুক্তির জোরে বিশ্বমঞ্চে মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কথা বলে, তার নেপথ্যের আসল কারিগর তো এই মানুষটিই। যাঁর একক প্রচেষ্টা আর সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতায় গড়ে উঠেছিল আজকের বিখ্যাত 'ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র' (BARC)।
ডক্টর হোমি জাহাঙ্গীর ভাভা
ডক্টর ভাবা ছিলেন সেই ক্ষণজন্মা মানুষ, যিনি কসমিক রশ্মির মতো জটিল পদার্থবিজ্ঞানের রহস্য যেমন ভেদ করেছিলেন, ঠিক তেমনই গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে দেশকে যদি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, তবে পরমাণু শক্তিতে আত্মনির্ভর হওয়া বাধ্যতামূলক। প্রতিরক্ষায় অস্ত্র হাতে যারা অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সেই শক্তির আসল কারিগরি জোগান দেন এই দূরদর্শী বিজ্ঞানীরাই। বিজ্ঞান যদি শক্তিশালী প্রযুক্তি না গড়ত, তবে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনো এতটা আধুনিক ও শক্তিশালী হতে পারত না। হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা কেবল পরমাণুর কণা নিয়েই খেলা করেননি, তিনি দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে এই বিশ্বাসটা বুনে দিয়েছিলেন যে—"আমরাও পারি!"
ডায়েরির পাতায় শুধু এইটুকুই লিখলাম, "সীমান্তের সুরক্ষা যদি দেশের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে, তবে বিজ্ঞান আর মেধার আলো দেশের আত্মাকে শক্তিশালী করে।"





Regional science Centre সম্পর্কে এই লেখাটা পড়ার আগে অবধি জানতাম না কিছুই....অনেক কিছুই শেখা ও জানার সুযোগ হলো...এই লেখা না পড়লে হয়তো কোনো কিছুই জানতে পারতাম না...কোনোদিনও দেখার সুযোগ হবে কিনা জানি না তবে এই লেখাটা পড়ে মনে হলো যেনো আমিও সশরীরে সেইখানে এই মহান ব্যক্তিদের মূর্তির সামনে উপস্থিত....
উত্তরমুছুনধন্যবাদান্তে আপনাকে,
উত্তরমুছুনআপনিও কখনো সুযোগ করে বেরিয়ে পড়েন