Inside Regional Science Centre Guwahati: এক ফৌজির চোখে বিজ্ঞান ও ইতিহাসের ম্যাজিক দুনিয়া

MiG 21 fighter aircraft display at Regional Science Centre Guwahati
.           
                                                                        MiG-21 (মিগ-২১)

MiG-21 (মিগ-২১):

 বিজ্ঞান পার্কের বাইরের সেই সহজ রূপকথার যন্ত্রগুলোর হাতল ঘোরানো শেষ করে যখন মূল মিউজিয়াম দিকে পা বাড়াচ্ছিলাম, ঠিক তখনই আচমকাই দাঁড়িয়ে গেলাম । চোখের সামনে ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় আকাশসীমার অতন্দ্র প্রহরী, আকাশযুদ্ধের এক জীবন্ত কিংবদন্তি—MiG-21 (মিগ-২১) যুদ্ধবিমান! রুপোলি রঙের এই শিকারি পাখির গায়ে আঁকা ভারতীয় বিমান বাহিনীর সেই গর্বের তেরঙা ।

এটি কেবল লোহার তৈরি কোনো বিমান নয়; এটি সেই অপরাজেয় যোদ্ধা যা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের 'অপারেশন সফেদ সাগর' (Operation Safed Sagar), এবং ২০১৯ সালে উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের হাত ধরে পাকিস্তানের আধুনিক F-16 বিমানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়েছিল। কার্গিলের সেই হাড় কাঁপানো দিনগুলোতে আমাদের মতো হাজার হাজার স্থল সেনার মাথার ওপর এই মিগ-২১ যখন সুরক্ষাকবচ হয়ে গর্জে উঠত, তখন বাঙ্কারে থাকা আমাদের মতো সেনার মনোবল বেড়ে যেত হাজার গুণ। বন্দুক আর বুলেটের দুনিয়া ছেড়ে বিজ্ঞানের আঙিনায় এসে নিজের এই পুরনো যুদ্ধক্ষেত্রের বন্ধুকে এভাবে আবিষ্কার করব, তা ভাবিননি,


 পারমাণবিক মডেলের ফোয়ারা (Atomic Model Fountain Sculpture): 

Atomic Model Fountain Sculpture at Regional Science Centre Guwahati
                             
                           পারমাণবিক মডেলের ফোয়ারা (Atomic Model Fountain Sculpture)


মিগ-২১ এর সেই গর্বিত মুহূর্তটি পেরিয়ে যখন ভবনের মূল প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে গেলাম, তখনই চোখে পড়ল আরেকটি দুর্দান্ত শিল্পকর্ম—একটি বিশাল পারমাণবিক মডেলের ফোয়ারা (Atomic Model Fountain Sculpture)! পাথরের ভিত্তির ওপর লোহা আর জলের মিশ্রণ এ তৈরি এই ভাস্কর্যটি এক নজরেই পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং পারমাণবিক শক্তির এক বিশাল জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। পরমাণুর কেন্দ্রের নিউক্লিয়াস আর তার চারপাশে অনবরত ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনের কক্ষপথের এই সুন্দর জ্যামিতিক রূপটি যেকোনো সাধারণ মানুষের মনেও বিজ্ঞান নিয়ে এক প্রাথমিক কৌতূহল তৈরি করে দেয়। বর্ডারে রডার টেকনোলজি বা সাবমেরিনের নিউক্লিয়ার পাওয়ারের মতো জটিল বিষয়গুলোর একদম গোড়ার রূপ যেন এই সহজ ফোয়ারাটি!

 ফ্রেশওয়াটার অ্যাকোয়ারিয়াম (Freshwater Aquarium Gallery):

সেই পারমাণবিক ফোয়ারার মায়া কাটিয়ে যখন মূল ভবনের প্রদর্শনী হলের ভেতর পা রাখলাম, তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠল আলো-ছায়ায় ঘেরা এক মায়াবী জলচর দুনিয়া—বিজ্ঞান কেন্দ্রের ফ্রেশওয়াটার অ্যাকোয়ারিয়াম (Freshwater Aquarium Gallery)! কাচের ওপারে নীল জলের বুকে ডানা মেলে সাঁতার কাটছে দেশ-বিদেশের নানা রঙবেরঙের সব মাছ। শান্ত হয়ে এককোণে ভেসে থাকা প্রকাণ্ড ধবধবে সাদা জায়ান্ট গৌরামি (Giant Gourami) থেকে শুরু করে রাজকীয় ভঙ্গিতে সাঁতার কাটা কমলারঙা অস্কার (Oscar Fish)—সবাই যেন এক একটি জ্যান্ত ক্যানভাস। একটু এগোতেই দেখা মিলল অ্যাকোয়ারিয়ামের চেনা বাসিন্দা সোনালী গোল্ডফিশ (Goldfish) আর একঝাঁক রুদ্ররূপী কালো ও অ্যালবিনো ইরিডিসেন্ট শার্ক (Iridescent Shark) বা পাঙ্গাসিয়াসের।
White Giant Gourami fish in aquarium at Guwahati Science Centre

Gourami fish

Orange Comet Goldfish swimming inside freshwater aquarium
                                                             
                                                                Orange Comet Goldfish

School of dark Iridescent Shark Pangasius fish in fish tank
      
                                                       dark Iridescent Shark Pangasius

Pair of tiger Oscar fish swimming in Regional Science Centre aquarium
  • tiger Oscar
Albino Iridescent Shark school with hand reflection in Guwahati Science Centre aquarium

                                                               Albino Iridescent Shark

Blood red Parrot Cichlid fish swimming in aquarium at Guwahati Science Centre

                                                    Blood red Parrot Cichlid

কাচের দেওয়ালে হাত রেখে মাছগুলোর পিছু পিছু চোখ বোলাতেই বুকের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ছোটবেলার সেই চঞ্চল দিনগুলো। শৈশবের সেই চেনা অভ্যাসে কাচের ওপার থেকে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কিছুক্ষণ 'হু, হ্যা' করে তাড়িয়ে বেড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম! মাছগুলোও যেন এক আমার চপলতা দেখে লেজ নেড়ে বুদবুদ উড়িয়ে কাচের ওপারে লুকোচুরি খেলছিল। জলজ জীবনের এই শান্ত মেকানিজম দেখতে দেখতে যখন কিছুটা হাঁপিয়ে উঠলাম, তখন মনের কোণে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বিজ্ঞানের পরবর্তী জাদুর খোঁজে আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম।

রসায়ন গ্যালারি (Chemistry Gallery):

Acharya P C Ray statue display inside Chemistry Gallery at Guwahati Science Centre

                                                                   Chemistry Gallery

অ্যাকোয়ারিয়ামের জলজ মায়া কাটিয়ে মনের ভেতর ছোটবেলার আনন্দ নিয়ে যখন পরবর্তী হলের দিকে পা বাড়াচ্ছিলাম, তখনই প্রবেশ করলাম এক ঐতিহাসিক আঙিনায়—বিজ্ঞান কেন্দ্রের রসায়ন গ্যালারি (Chemistry Gallery)। সেখানে ঢুকতেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল এক ধবধবে সাদা শান্ত মূর্তির সামনে। তিনি আর কেউ নন, ভারতীয় রসায়ন শিল্পের জনক এবং মহান দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (P. C. Ray)! ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর ফ্লাস্ক হাতে গবেষণারত তাঁর এই জীবন্ত ভাস্কর্যটি এক নিমেষে মনে করিয়ে দেয় ব্রিটিশ আমলের সেই পরাধীন ভারতের কঠিন বাস্তবতার কথা।

সেই যুগে যখন ভারতের বাজারে সমস্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ আর রাসায়নিক জিনিসপত্র বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হতো, তখন এই মহান মানুষটি সেই দাসত্বের ও বিদেশি নির্ভরতার শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েছিলেন। আমাদের দেশীয় গাছপালা, ভেষজ সম্পদ আর নিজের অক্লান্ত গবেষণার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশেই প্রথম বিশ্বমানের ওষুধ তৈরি শুরু করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক 'বেঙ্গল কেমিক্যালস'। একজন কর্মরত সৈনিক হিসেবে সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যদি আমাদের দায়িত্ব হয়, তবে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতো মনীষীরা গবেষণাগারে বসে ভারতের অর্থনৈতিক ও চিকিৎসাক্ষেত্রের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। রসায়নের এই কক্ষটি কেবল বিজ্ঞানের সূত্র নয়, বরং এক জওয়ানের চোখে আত্মনির্ভর ভারতের এক মন্দির হয়ে উঠল!

ডিএনএ মডেল (DNA Model):

এই রসায়ন গ্যালারি তে আরো কিছু মডেল ছিল যার মধ্যে একটি হলো বিশাল কাচের সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা দ্বিসূত্রক ডিএনএ মডেল (DNA Model)। মানুষের জীবন রহস্যের যে মূল কোড, সেই ডিএনএ-র ঘূর্ণায়মান সিঁড়ির মতো গঠনটি লাইটিংয়ের আলোয় বেশ চমৎকার লাগছিলো 
DNA double helix structure model inside Science Museum Guwahati


                                                          DNA MODEL


ইলেক্ট্রোপ্লেটিং বা তড়িৎলেপন (Electroplating Exhibit):


Electroplating chemical experiment display inside Chemistry Gallery

                                               Electroplating Exhibit

এই গ্যালারি তেই ছিল তড়িৎ রসায়নের এক জীবন্ত পরীক্ষা—ইলেক্ট্রোপ্লেটিং বা তড়িৎলেপন (Electroplating Exhibit)-এর মডেল। কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি ধাতুর ওপর আরেকটি ধাতুর পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়, তা খুব সুন্দরভাবে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মিলিটারির বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র তৈরিতে বা জং ধরা রোধ করতে এই মেকানিজমের গুরুত্ব অপরিসীম।

বাকমিনস্টারফুলারিন বা বাকিবল (Buckyball / Carbon 60 Model):

Buckminsterfullerene Buckyball Carbon 60 molecule model exhibit

                                          Buckyball / Carbon 60 Model

একটি কার্বন অণুর ফুটবল আকৃতির খাঁচা বা বাকমিনস্টারফুলারিন বা বাকিবল (Buckyball / Carbon 60 Model)-এর পরমাণু কাঠামোর মুখোমুখি হলাম। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার ভেতরের এই সুনিপুণ জ্যামিতিক নকশাগুলো দেখতে দেখতে বিজ্ঞানের প্রতি মুগ্ধতা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
বিজ্ঞানের এই সহজ রূপকথা আমার ভেতরের ঘুমন্ত শৈশবকে যেমন জাগিয়ে তুলল, তেমনই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সেই মূর্তি আমাকে মনে করিয়ে দিল আত্মনির্ভর ভারতের আসল শক্তি। সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেশ রক্ষা করা যদি আমার কর্তব্য হয়, তবে দেশের এই বিজ্ঞান ও মনীষীদের ঐতিহ্য বুকে আগলে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। স্যালুট ভারতের বিজ্ঞান ও বীর যোদ্ধাদের!
বন্দুকের নল দেশ রক্ষা করে ঠিকই, কিন্তু মেধার আলো দেশকে বিশ্বমঞ্চে অপরাজেয় করে তোলে।

TRAVEL GUIDE ( ভ্রমণ গাইড )

 আপনি যদি রাস্তা দেখতে চান তাহলে সরাসরি click করুন এখানে  https://maps.app.goo.gl/3gsEzCmfpE3Q5ce6A

কি ভাবে পৌঁছাবেন : 

আপনি যদি গুয়াহাটি রেল স্টেশন বা পল্টন বাজার থেকে আসেন, তবে জি.এস. রোড 7ধরে সরাসরি খানাপাড়ার দিকে চলে আসতে পারেন। দূরত্ব মাত্র ৮-৯ কিলোমিটার। রাস্তা অত্যন্ত মসৃণ এবং সোজা। খানা পাড়া বাস স্টপ এ নেমে toto কিংবা auto করে সোজা ৫ মিনিট এ পৌছিয়ে যাওয়া যাই।


আর যদি ফ্লাইট এ আসেন, এয়ারপোর্ট থেকে সিটি বাস ও শেয়ার ট্যাক্সি (উবার/ওলা) ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যায়। আপনাকে শুধু বলতে হবে "খানাপাড়া তাজ ভিভান্তার সামনের ওভারব্রিজ"। এখান থেকে ৮-১০ মিনিট পায়ে হেটে পৌছিয়ে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যে 
 
সময় : রবিবার থেকে শনিবার ০৯. ৩০ - ১৮. ০০
  


 প্রবেশ মূল্য : online - 55.00

                  Off line - 60.00

 থাকা ও খাওয়া : আশেপাশে অনেক বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল এখানে আছে 

মন্তব্যসমূহ